সংবাদ শিরোনাম

দক্ষিণ এশিয়ার পানি রাজনীতি: ন্যায্যতা ও যৌথ ব্যবস্থাপনার তাগিদ চবির সেমিনারে

 প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৫৫ অপরাহ্ন   |   চট্টগ্রাম

দক্ষিণ এশিয়ার পানি রাজনীতি: ন্যায্যতা ও যৌথ ব্যবস্থাপনার তাগিদ চবির সেমিনারে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে দক্ষিণ এশিয়ার হাইড্রোপলিটিক্স বিষয়ক সেমিনার

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি:

দক্ষিণ এশিয়ায় নদী ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় ন্যায্যতা, পারস্পরিক আস্থা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত এক সেমিনারের বক্তারা। তাঁদের মতে, পানি এখন শুধু প্রাকৃতিক সম্পদ নয়; এটি আঞ্চলিক সম্পর্ক, অর্থনীতি, পরিবেশ ও ভূরাজনীতির সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।

বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) সকাল ১০টায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞান অনুষদের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের পঞ্চম তলার কনফারেন্স কক্ষে ‘দক্ষিণ এশিয়ার হাইড্রোপলিটিক্স: পানি বণ্টন, ক্ষমতা ও ভূরাজনীতি’ শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। সাউথ এশিয়া ইয়ুথ ফর পিস অ্যান্ড প্রসপারিটি সোসাইটি এ আয়োজন করে। অনুষ্ঠানটির খবর ও আলোচনার বিষয়বস্তু নিয়ে একই দিনে বাসসসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমেও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।

সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. ইকবাল সরোয়ার।

পানির রাজনীতি শুধু বণ্টনের হিসাব নয়

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশ স্টাডিজ বিভাগের ফ্যাকাল্টি মুহাম্মদ তানবীরুল ইসলাম। তিনি বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার হাইড্রোপলিটিক্স বুঝতে শুধু কোন দেশ কতটুকু পানি পাবে বা কোন দেশ নদীর প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করবে—এমন সরল হিসাব যথেষ্ট নয়।

তাঁর মতে, নদীর উজান ও ভাটির ভৌগোলিক অবস্থান, পানিপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা, প্রযুক্তিগত সুবিধা, তথ্যপ্রাপ্তি এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তির ভারসাম্য—সবকিছু মিলেই পানিকে ঘিরে দর-কষাকষির সক্ষমতা তৈরি হয়।

তিনি বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার নদীগুলোর ভবিষ্যৎ শুধু পানি ভাগাভাগির প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে সহযোগিতা, ন্যায্যতা এবং অভিন্ন দায়িত্ববোধও জড়িত। নদী যেমন রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে যোগাযোগ ও সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে, তেমনি অসম ব্যবস্থাপনা ও পারস্পরিক অবিশ্বাসের কারণে তা বিরোধের কারণও হয়ে উঠতে পারে।

তানবীরুল ইসলাম আরও বলেন, ভবিষ্যতের পানি নিরাপত্তা নির্ভর করবে দেশগুলো প্রতিযোগিতার পরিবর্তে তথ্য বিনিময়, পারস্পরিক আস্থা এবং যৌথ নদী ব্যবস্থাপনার দিকে কতটা এগোতে পারে তার ওপর।

পানিকে রাজনৈতিক হাতিয়ার না করার আহ্বান

আলোচনায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. এ. কে. এম. মাহফুজুল হক দক্ষিণ এশিয়ায় পানিকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

তিনি বলেন, পানিকে কেন্দ্র করে যেকোনো ধরনের রাজনৈতিক চাপ বা আধিপত্যের চেষ্টা এ অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বাংলাদেশের নদী ও পানির অধিকার নিয়ে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়েও তিনি সমালোচনামূলক বক্তব্য দেন। তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল—আঞ্চলিক পানি সমস্যার সমাধানে শক্তির ভারসাম্যের পরিবর্তে ন্যায্যতা ও সহযোগিতাকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। একই ধরনের বক্তব্যের উদ্ধৃতি বাসসের প্রতিবেদনেও প্রকাশিত হয়েছে।

তিনি পানি ও নদী বিষয়ক জটিলতা চিহ্নিত করতে বহুমাত্রিক গবেষণা জোরদারের আহ্বান জানান। পাশাপাশি সরকারি নীতি প্রণয়নে গবেষণা ও বিশেষজ্ঞ মতামতের ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন।

নদী নিয়ে একাডেমিক গবেষণার ওপর গুরুত্ব

‘দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড’-এর চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান সামচ্ছুদ্দিন ইলিয়াস বলেন, বাংলাদেশের নদীগুলো নিয়ে আরও বিস্তৃত একাডেমিক গবেষণা প্রয়োজন। দেশের অর্থনীতি ও জাতীয় উৎপাদনে নদীগুলোর অবদান কতটা, তা গবেষণার মাধ্যমে নির্দিষ্টভাবে তুলে আনার প্রয়োজন রয়েছে।

ভারতের সঙ্গে পানি চুক্তিগুলোর ভবিষ্যৎ আলোচনার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শুধু চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর চিন্তায় সীমাবদ্ধ না থেকে জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতায় নতুন নতুন ন্যায্যতার বিষয় আলোচনায় আনা প্রয়োজন। এ ধরনের আলোচনায় বাংলাদেশের কার্যকর অংশগ্রহণও গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তথ্যভিত্তিক চুক্তির তাগিদ

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. কাজী মো. বরকত আলী বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় পানি বণ্টনে ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে গবেষণাভিত্তিক তথ্যের ওপর নির্ভর করে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে জনবান্ধব চুক্তি গড়ে তোলা প্রয়োজন।

তাঁর মতে, নদী ও পানিসম্পদকে বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় হিসেবে না দেখে পরিবেশ, কৃষি, জনজীবন, অর্থনীতি ও আঞ্চলিক সম্পর্কের সঙ্গে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করতে হবে।

তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর আহ্বান

চট্টগ্রাম মহানগর সাংবাদিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সালেহ সোলায়মান বলেন, তরুণ প্রজন্মকে পানি ব্যবহারের নীতিমালা ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে আরও সচেতন হতে হবে।

তিনি পানি ব্যবহারে দায়িত্বশীলতা এবং ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করার দাবিতে তরুণদের সক্রিয় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান।

চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সভাপতি এবং দৈনিক আমার দেশের আবাসিক সম্পাদক জাহিদুল করিম কচি বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় পানি ক্রমেই ভূরাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠছে। তাই আধিপত্যের মানসিকতা বাদ দিয়ে বাস্তবভিত্তিক গবেষণা ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে পানি ব্যবস্থাপনার কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন।

তিনি বাংলাদেশের পানির অধিকার রক্ষায় তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

যৌথ ব্যবস্থাপনায় সমাধানের পথ

সেমিনারে বক্তারা বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার পানি সংকটকে কেবল দ্বিপক্ষীয় বিরোধ হিসেবে দেখলে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান পাওয়া কঠিন। নদী অববাহিকাভিত্তিক পরিকল্পনা, তথ্য আদান-প্রদান, যৌথ গবেষণা, পরিবেশগত তথ্য বিশ্লেষণ এবং পারস্পরিক আস্থার ভিত্তিতে পানি ব্যবস্থাপনার নতুন কাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে।

তাঁদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নদীর প্রবাহ ও পানির প্রাপ্যতায় পরিবর্তন আসছে। ফলে ভবিষ্যতের পানি চুক্তিগুলোতেও পরিবর্তিত পরিবেশগত বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।

সেমিনারে আলোচনার মধ্য দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার পানি রাজনীতিকে সংঘাতের পরিবর্তে সহযোগিতা, গবেষণা ও ন্যায্যতার কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

আরো পড়ুন---৮১৫ কোটি টাকার গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প