ম্যাক্রোঁর সফরের সময় দামেস্কে জোড়া বিস্ফোরণ; নাজুক স্থিতিশীলতার ওপর নতুন করে চাপ
আন্তর্জাতিক ডেক্স নিউজ:
ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সিরিয়া সফরের সময় মঙ্গলবার রাজধানী দামেস্কে একাধিক বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার নেতৃত্বাধীন বাহিনী বাশার আল-আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোনো শীর্ষ নেতার এটিই ছিল সিরিয়া সফরের প্রথম ঘটনা।
এর আগে গত সপ্তাহে দামেস্কের একটি ক্যাফেতে পৃথক এক বোমা বিস্ফোরণে অন্তত নয়জন নিহত হন।
মঙ্গলবারের সর্বশেষ বিস্ফোরণে অন্তত ১৮ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সানা (SANA) জানিয়েছে, ফরাসি প্রেসিডেন্ট যে হোটেলে অবস্থান করছিলেন তার কাছে নিরাপত্তা বাহিনী একটি বিস্ফোরক নিষ্ক্রিয় করার চেষ্টা করছিল। এ সময় প্রথম বিস্ফোরণটি ঘটে এবং কয়েক মিনিট পর আরেকটি বিস্ফোরণ হয়।
দুই বছর আগে আল-আসাদ সরকারের পতনের পর থেকে আল-শারার সরকার নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। দীর্ঘ গৃহযুদ্ধ, গভীর রাজনৈতিক বিভাজন এবং রাশিয়া, ইরান ও তাদের মিত্র শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মতো বহিরাগত শক্তির হস্তক্ষেপে ক্ষতবিক্ষত একটি দেশের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে সরকারকে উচ্চ বেকারত্ব, দুর্বল আইনের শাসন এবং পুনর্গঠনের কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করতে হচ্ছে।
সাম্প্রতিক বিস্ফোরণগুলোর দায় এখনো কেউ স্বীকার করেনি। তবে ধারণা করা হচ্ছে, এর পেছনে আইএসআইএল (আইএস) জঙ্গিগোষ্ঠীর অবশিষ্ট সদস্যরা থাকতে পারে। উত্তর-পূর্ব সিরিয়ার রাক্কা একসময় আইএসের কথিত রাজধানী ছিল এবং তাদের নৃশংসতার প্রতীক হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিল। জাতিসংঘের হিসাবে, বর্তমানে সিরিয়া ও প্রতিবেশী ইরাকে এই গোষ্ঠীর প্রায় ১,৫০০ থেকে ৩,০০০ যোদ্ধা সক্রিয় রয়েছে।
নিউইয়র্কভিত্তিক থিংক ট্যাঙ্ক ‘সেঞ্চুরি ইন্টারন্যাশনাল’-এর ফেলো অ্যারন লুন্ড আল জাজিরাকে বলেন, “আইএস এখনো টিকে আছে এবং সক্রিয় রয়েছে।” তাঁর মতে, সাম্প্রতিক বিস্ফোরণের দায় নিয়ে যে জল্পনা চলছে, তার বেশিরভাগই এই গোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে।
তিনি বলেন, “এটা সংখ্যার বিষয় নয়। বড় ধরনের প্রভাব সৃষ্টি করতে মাত্র কয়েকজন লোকই যথেষ্ট, যারা একটি বোমা তৈরি করে সেটি স্থাপন করতে পারে।” তাঁর ভাষ্য, সরকার স্বাভাবিক পরিস্থিতির বার্তা দিতে, পর্যটন বাড়াতে এবং জরুরি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টা করছে। কিন্তু এ ধরনের হামলা খুব সহজেই সেই প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করতে পারে। তিনি আরও বলেন, “রাজনৈতিক ও মানসিক—উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই এর চেয়ে খারাপ সময়ে এমন ঘটনা ঘটতে পারত না।”
সশস্ত্র গোষ্ঠী ও বিভক্ত ক্ষমতার বাস্তবতা
বহু বছরের সংঘাতের পর আল-শারা দেশের প্রায় পুরো অংশের নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হলেও, অনেক এলাকায় আইনের শাসন এখনো স্থানীয় মিলিশিয়াদের ওপর নির্ভরশীল, যাদের সেনাবাহিনীর সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আবার কোথাও কোথাও কার্যকর সরকারি নিয়ন্ত্রণ প্রায় অনুপস্থিত। পাশাপাশি, দীর্ঘ সংঘাতের উত্তরাধিকার হিসেবে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী এখনো সক্রিয় রয়েছে।
আল-আসাদপন্থী শক্তিগুলোর পাশাপাশি ইরানের সমর্থিত একাধিক শিয়া মিলিশিয়াও এখনো কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। একই সময়ে ইরান, ইরাক, লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ এবং ইসরায়েলের সঙ্গে বিদ্যমান অবিশ্বাস ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা আল-শারার রাষ্ট্রগঠনের প্রচেষ্টাকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিশেষ করে ইসরায়েল সিরিয়ার দ্রুজ সংখ্যালঘুদের সমর্থনের মাধ্যমে সরকারবিরোধী অবস্থানকে উৎসাহিত করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক নানার হাওয়াচ বলেন, “আনুষ্ঠানিকভাবে দামেস্ক এখন সিরিয়ার অধিকাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে। এর মধ্যে প্রধান শহরগুলো এবং জানুয়ারির একীভূতকরণ চুক্তির পর উত্তর-পূর্বাঞ্চলও রয়েছে।” তবে তাঁর মতে, সরকারের নিয়ন্ত্রণ পশ্চিম ও মধ্যাঞ্চলে সবচেয়ে শক্তিশালী হলেও দক্ষিণ সীমান্ত এবং দ্রুজ অধ্যুষিত এলাকায় তা তুলনামূলকভাবে দুর্বল।
হাওয়াচ আরও বলেন, “সিরিয়ায় সরকারের অবশিষ্ট প্রতিপক্ষকে মোটামুটি তিনটি আলাদা শ্রেণিতে ভাগ করা যায়, যাদের লক্ষ্য ও কর্মকৌশল ভিন্ন। আইএসের গোপন সেলগুলো সরকার-নিয়ন্ত্রিত এলাকায় হামলা চালিয়ে নতুন শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করতে চায়। সাবেক সরকারের অবশিষ্ট অনুগতরা বিচ্ছিন্ন নাশকতামূলক নেটওয়ার্ক হিসেবে কাজ করছে। অন্যদিকে সুয়াইদা ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো দামেস্ক কীভাবে তাদের শাসন করবে এবং রাষ্ট্রের সঙ্গে একীভূত করবে—সে বিষয়টি নিয়ে শক্তি প্রয়োগের সক্ষমতা ধরে রেখেছে।”
২০২৫ সালের জুলাইয়ে দ্রুজ ও স্থানীয় বেদুইন জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষ পূর্ণাঙ্গ সহিংসতায় রূপ নেয়। পরে সিরিয়ার সরকারি বাহিনী দ্রুজ অধ্যুষিত সুয়াইদা শহরে প্রবেশ করলে, ইসরায়েল দ্রুজদের সুরক্ষার দাবি তুলে ওই এলাকায় হামলা চালায়।
এদিকে সাবেক সরকারের অনুগত শক্তিগুলোও সাম্প্রতিক সময়ে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। চলতি সপ্তাহের শুরুতে আল-আসাদের বিলিয়নিয়ার চাচাতো ভাই রামি মাখলুফ, যিনি জানুয়ারিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনের মতে মস্কোতে নির্বাসিত অবস্থান থেকে সিরিয়ার আলাওয়ি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কাছে অর্থ পাঠাচ্ছিলেন, একটি ভিডিও বার্তায় দামেস্ক সরকারের প্রতি হুমকিসূচক বক্তব্য দেন। তিনি সব আলাওয়ি বন্দির মুক্তি দাবি করে বলেন, “আমি যখন বলি কিছু করব, তখন তা করেই ছাড়ি।”
অভ্যন্তরীণ সংকটও বড় হুমকি
বিশ্লেষকদের মতে, আল-শারার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর কিছু হয়তো তাঁর নিজের সমর্থক গোষ্ঠীর ভেতর থেকেই আসতে পারে।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে দ্রুত অগ্রযাত্রার সময় আল-শারা মূলত রক্ষণশীল হায়াত তাহরির আল-শাম (এইচটিএস) এবং আরও কয়েকটি প্রতিদ্বন্দ্বী, অনেক ক্ষেত্রেই ধর্মীয় আদর্শে অনুপ্রাণিত সশস্ত্র গোষ্ঠীর ওপর নির্ভর করেছিলেন।
কিন্তু আল-আসাদের পতনের উচ্ছ্বাসের পর এখন বাস্তবতা ভিন্ন। ১৪ বছরের যুদ্ধ, ব্যাপক দুর্নীতি এবং দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞায় ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনীতি নিয়ে দেশ পরিচালনা করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠেছে।
বিদেশি বিনিয়োগ এখনো প্রত্যাশিত মাত্রায় না এলেও নিষেধাজ্ঞা শিথিলের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ২০২৫ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সিরিয়ার উন্নয়ন, সরকারের কার্যক্রম পরিচালনা এবং দেশের সামাজিক কাঠামো পুনর্গঠনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা শিথিলের ঘোষণা দেন। এ সিদ্ধান্ত অনেক পর্যবেক্ষককে বিস্মিত করে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, নিষেধাজ্ঞা শিথিল ভবিষ্যতে বিনিয়োগ আকর্ষণে সহায়ক হলেও, এর ফলে আল-শারার মূল সমর্থক রক্ষণশীল তরুণদের একটি অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে। এই তরুণদের অনেকেই বর্তমানে বেকার এবং ক্ষমতা দখল ও ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।
নিউ লাইনস ইনস্টিটিউটের ক্যারোলিন রোজ বলেন, “আমার মনে হয় নতুন সরকারের সবচেয়ে বড় হুমকি ভেতর থেকেই আসছে।” তাঁর মতে, এটি কোনো একক ব্যক্তি বা সংগঠনের কারণে নয়; বরং ক্রমবর্ধমান বিভাজনের একটি ধারাবাহিক প্রবণতার ফল।
তিনি আরও বলেন, “আল-শারার মূল সমর্থকগোষ্ঠী এবং সাবেক এইচটিএস ঘনিষ্ঠদের একটি অংশ যদি মনে করে যে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন এবং তুলনামূলক মধ্যপন্থী নীতির কারণে তাদের স্বার্থ উপেক্ষিত হচ্ছে, তাহলে তারা সরকার কিংবা ব্যক্তিগতভাবে আল-শারার বিরুদ্ধে সংগঠিত প্রচারণা চালাতে পারে।”
সূত্র: আলজাজিরা