এল নিনো: অস্ট্রেলিয়ার ভয়াবহ জলবায়ু সতর্কতা
আন্তর্জাতিক ডেক্স নিউজ:
অস্ট্রেলিয়া আবারও ভয়াবহ জলবায়ু সংকটের মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা করছে। দেশটির আবহাওয়া ব্যুরো জানিয়েছে, প্রশান্ত মহাসাগরের ক্রান্তীয় অঞ্চলে এল নিনো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যা বছরের দ্বিতীয়ার্ধে আরও ঘনীভূত হয়ে গত সাত দশকের মধ্যে অন্যতম শক্তিশালী রূপ নিতে পারে।
সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ইতোমধ্যেই এল নিনোর জন্য নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করেছে। বায়ুমণ্ডলীয় সূচকগুলোও একই ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্রান্তীয় মধ্য প্রশান্ত মহাসাগরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবারের এল নিনোকে শক্তিশালী থেকে অত্যন্ত শক্তিশালী পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে। প্রায় অর্ধেক গাণিতিক মডেল ভবিষ্যদ্বাণী করছে, এটি ১৯৫০ সালের পর রেকর্ড করা এল নিনোগুলোর মধ্যে সবচেয়ে তীব্র হতে পারে।
বৈশ্বিক প্রভাব
এল নিনোর প্রভাবে উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকায় অতিবৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। বিপরীতে এশিয়ায় দেখা দিতে পারে প্রচণ্ড গরম ও শুষ্ক আবহাওয়া। ইতোমধ্যেই এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ফসল রোপণে সমস্যা দেখা দিয়েছে, যা খাদ্য সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ার জন্যও এটি ভয়াবহ সংকেত। কারণ শীত ও বসন্তকালে বৃষ্টিপাত কমে গিয়ে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হয়। পূর্ব উপকূলে খরা দেখা দেয় এবং দক্ষিণাঞ্চলে দিনের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়।
অতীতের অভিজ্ঞতা
২০২৩-২০২৪ সালে এল নিনোর কারণে অস্ট্রেলিয়া ইতিহাসের সবচেয়ে শুষ্ক তিন মাস পার করেছিল। এর আগে ২০১৫-২০১৬ সালের এল নিনোতে ব্যাপক খরা দেখা দিয়েছিল, যার ফলে তেলবীজ ও শস্য উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমে যায়। ইতিহাসবিদরা মনে করিয়ে দেন, এল নিনোর প্রভাবে অতীতে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ হয়েছে। ১৮৭৭ ও ১৮৭৮ সালের দুর্ভিক্ষে লাখ লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন।
জলবায়ু পরিবর্তনের ভূমিকা
বিজ্ঞানীরা সতর্ক করছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এবারের এল নিনো আরও ভয়াবহ হতে পারে। সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এর প্রভাব তীব্রতর হবে। জাতিসংঘের বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে, এল নিনো সাধারণত প্রতি দুই থেকে সাত বছর অন্তর দেখা দেয় এবং একেকবার ৯ থেকে ১২ মাস স্থায়ী হয়। সংস্থার সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন থেকে আগস্টের মধ্যে এল নিনো ঘটার সম্ভাবনা ৮০ শতাংশ এবং নভেম্বর পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা ৯০ শতাংশেরও বেশি।
বৈশ্বিক জরুরি সতর্কতা
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এটিকে ‘জরুরি জলবায়ু সতর্কতা’ হিসেবে গ্রহণ করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, সংকট মোকাবিলায় সমানুপাতিক পদক্ষেপ নিতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার ত্বরান্বিত করা, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেওয়া এবং সবার জন্য আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
পরিশেষে,
অস্ট্রেলিয়ার সতর্কবার্তা শুধু দেশটির জন্য নয়, পুরো বিশ্বের জন্যই এক বড় সংকেত। এল নিনো শুধু কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতি ও মানবজীবনের ওপরও গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে এই প্রাকৃতিক ঘটনাকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই।