শ্রমিক অধিকার লঙ্ঘন: বাংলাদেশের পণ্যে ১০ শতাংশ নতুন শুল্ক আরোপের পথে যুক্তরাষ্ট্র
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
বিশ্ববাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশাধিকার নিয়ে আবারও বড় ধরনের সংকটের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। শ্রমিকদের জোরপূর্বক শ্রমে বাধ্য করার অভিযোগে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৬০টি অর্থনীতির ওপর নতুন করে শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপের পরিকল্পনা করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যেসব দেশ জোরপূর্বক শ্রম বন্ধের শর্ত পূরণে ব্যর্থ হয়েছে, তাদের ওপর এই অতিরিক্ত করের বোঝা চাপানো হবে। এই তালিকায় থাকা বাংলাদেশের ওপর নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের একটি প্রস্তাব মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি কার্যালয় (ইউএসটিআর) ইতোমধ্যে পেশ করেছে। তবে বাংলাদেশসহ অভিযুক্ত অন্য দেশগুলো ওয়াশিংটনের এই অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছে।
মার্কিন প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, বহুল আলোচিত বাণিজ্যে বৈষম্যমূলক আচরণের ‘৩০১ ধারা’র ওপর ভিত্তি করে এই নতুন শুল্ক কাঠামোর প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, এটি মূলত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পূর্ববর্তী জরুরি শুল্ক কাঠামোকে ভিন্ন উপায়ে কার্যকর করার একটি নতুন কৌশল। এর আগে ট্রাম্প প্রশাসন দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই বিভিন্ন দেশের ওপর একতরফাভাবে শুল্ক আরোপ করেছিল। কিন্তু চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে মার্কিন আদালত সেই শুল্ক কাঠামোকে অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেন। আদালত স্পষ্ট জানিয়েছিল যে, ১৯৭৭ সালের জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইনের আশ্রয় নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন এভাবে ঢালাওভাবে কোনো শুল্ক চাপাতে পারে না। আদালতের সেই ধাক্কার পর মার্কিন সরকার উচ্চ আদালতে আপিল করলেও, আইনি লড়াইয়ের সমান্তরালে এখন এই নতুন কৌশলে শুল্ক আরোপের দিকে এগোচ্ছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।
ইউএসটিআর-এর প্রস্তাবনা অনুযায়ী, বাংলাদেশ ছাড়াও কানাডা, ইকুয়েডর, ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশসমূহ, ইন্দোনেশিয়া, মেক্সিকো, পাকিস্তান, আর্জেন্টিনা, কম্বোডিয়া, এল সালভাদর, গুয়েতেমালা, মালয়েশিয়া, তাইওয়ান এবং যুক্তরাজ্যের ওপর বাড়তি ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে, তদন্তের আওতায় থাকা বাকি ৪৫টি দেশের ওপর শুল্কের হার আরও বেশি, প্রায় সাড়ে ১২ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এই উচ্চ শুল্কের তালিকায় রয়েছে চীন, ভারত, নাইজেরিয়া, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ভিয়েতনাম, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডের মতো বড় বড় অর্থনৈতিক পরাশক্তি।
এই কড়া পদক্ষেপের পক্ষে যুক্তি দিয়ে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি কার্যালয়ের প্রতিনিধি জেমিসন গ্রির এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য সহযোগী দেশগুলো যখন জোরপূর্বক শ্রম দিয়ে তৈরি পণ্য আমদানির বিষয়টি ঠেকাতে ব্যর্থ হয়, তখন তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। তাঁর মতে, এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে মার্কিন শ্রমিকদের এক চরম অসম প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে, যা মার্কিন অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের জন্য ক্ষতিকর।
তবে এই শুল্ক এখনই চূড়ান্ত হচ্ছে না। মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি কার্যালয় জানিয়েছে, প্রস্তাবিত শুল্ক এবং অন্যান্য প্রতিকারমূলক ব্যবস্থার বিষয়ে আগামী ৬ জুলাই পর্যন্ত সাধারণ মানুষ ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত নেওয়া হবে। এরপর আগামী ৭ জুলাই এই বিষয়ে একটি আনুষ্ঠানিক গণশুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে। সেই শুনানির পরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে। বাংলাদেশের জন্য এই পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগের, কারণ তৈরি পোশাকসহ প্রধান রপ্তানি খাতের একটি বড় অংশ মার্কিন বাজারের ওপর নির্ভরশীল। ফলে নতুন করে এই ১০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হলে দেশের রপ্তানি বাণিজ্য এবং সামগ্রিক অর্থনীতি বড় ধরনের চাপের মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
তথ্য সূত্র: আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স।