হাদির খুনি নিয়ে মন্তব্য করে বিপাকে মমতা: সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের অভিযোগে দেশদ্রোহিতার মামলা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির একটি বিতর্কিত মন্তব্যকে কেন্দ্র করে ভারত ও প্রতিবেশি রাষ্ট্র বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে টানাপোড়েন এবং দেশের অভ্যন্তরীণ সুরক্ষার সংকটের অভিযোগ উঠেছে। বাংলাদেশের একটি আলোচিত হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য কারিগরদের নিয়ে মন্তব্য করার জেরে এবার মমতার বিরুদ্ধে কঠোর সন্ত্রাস দমন আইন বা ইউএপিএ (UAPA)-এর একাধিক ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। শিলিগুড়ির সাইবার থানায় এই দেশদ্রোহিতার মামলাটি দায়ের করেছেন রিঙ্কি সিং নামের স্থানীয় এক আইনজীবী। আগামী সোমবার ভারতের হাইকোর্ট খুললে সাবেক এই মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আবেদন করা হবে বলে জানা গেছে, যা বর্তমান রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।
ঘটনার সূত্রপাত ঘটে গত ২ মে, যখন এক জনসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে মমতা ব্যানার্জি নাম উল্লেখ না করে বাংলাদেশ সংক্রান্ত একটি স্পর্শকাতর মন্তব্য করেন। তিনি দাবি করেন, বাংলাদেশে নির্দিষ্ট একটি হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে কারা জড়িত এবং কাকে দিয়ে সেই খুনটি করানো হয়েছিল, তা তিনি ভালো করেই জানেন। একই সাথে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্সের (এসটিএফ) ভূয়সী প্রশংসা করে তিনি জানান যে, বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে আসা এক বড় মাপের খুনিকে মেঘালয় সীমান্ত পার হয়ে বাংলায় ঢোকার পর এসটিএফ গ্রেপ্তার করেছিল। ওই গ্রেপ্তারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে ব্যাপক রাজনৈতিক আলোড়ন বা 'রেভল্যুশন' তৈরি হয়েছিল বলেও তিনি উল্লেখ করেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মমতা ব্যানার্জি তার বক্তব্যে সরাসরি নাম না নিলেও তিনি মূলত বাংলাদেশের বহুল চর্চিত চরিত্র ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের দিকেই ইঙ্গিত করেছেন।
বক্তব্যের এখানেই শেষ ছিল না। মমতা ব্যানার্জি এই ঘটনার সাথে ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নামও জড়িয়ে দেন। তিনি প্রকাশ্য জনসভায় দাবি করেন যে, ওই অভিযানের পর ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজে তাকে ফোন করে অনুরোধ করেছিলেন যেন এই তথ্যটি কোনোভাবেই বাইরে প্রকাশ না পায়, কারণ বিষয়টি দেশের জাতীয় স্বার্থের সাথে জড়িত ছিল। সাবেক মুখ্যমন্ত্রীর মুখ থেকে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার এমন অত্যন্ত গোপনীয় এবং স্পর্শকাতর তথ্য জনসমক্ষে চলে আসায় তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে আইনি ও রাজনৈতিক মহলে।
মামলার বাদী আইনজীবী রিঙ্কি সিং সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, মমতা ব্যানার্জি যখন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন, তখন তিনি দেশের সুরক্ষা, সংহতি ও সার্বভৌমত্ব বজায় রাখার সাংবিধানিক শপথ নিয়েছিলেন। কিন্তু তার এই অবিবেচকের মতো মন্তব্যের ফলে প্রতিবেশি রাষ্ট্র বাংলাদেশের সাথে ভারতের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ ও কূটনৈতিক সম্পর্ক চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তিনি আরও আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, এই বক্তব্যের সূত্র ধরে বাংলাদেশে ভারতবিরোধী উগ্রপন্থী শক্তিগুলো নতুন করে সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে সেখানকার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তার ওপর।
আইনজীবী আরও মনে করিয়ে দেন যে, ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড নিয়ে খোদ বাংলাদেশ সরকার কিংবা নিহতের পরিবার—কেউই কখনো ভারতের দিকে আঙুল তোলেনি। এমন পরিস্থিতিতে ভারতের একটি রাজ্যের সাবেক প্রশাসনিক প্রধানের এই ধরণের দাবি দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এক বিশাল বিপদের জন্ম দিয়েছে। যে ইউএপিএ আইনে মমতার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে, তা মূলত একটি চরম কঠোর সন্ত্রাস দমন আইন। এই আইনের অধীনে আনা অভিযোগগুলো জামিন অযোগ্য এবং প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতেই অভিযুক্তকে দীর্ঘ মেয়াদে জেল হেফাজতে রাখার বিধান রয়েছে। ফলে আইনি পরিমণ্ডলে এই মামলাটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে।