সংবাদ শিরোনাম

কান্তজিউ মন্দির — দিনাজপুরের তীর্থ ও টেরাকোটা ঐতিহ্য

 প্রকাশ: ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৭:২৮ অপরাহ্ন   |   জেলার খবর

কান্তজিউ মন্দির — দিনাজপুরের তীর্থ ও টেরাকোটা ঐতিহ্য

নরসিংদী প্রতিনিধি 

দিনাজপুর জেলার কাহারোল উপজেলার ঢেপা নদীর তীরবর্তী কান্তনগর গ্রামে অবস্থিত কান্তজিউ মন্দির বাংলার এক কিংবদন্তী স্থাপত্য ও ধর্মীয় তীর্থস্থান। এটি শুধু একটি মন্দিরই নয় — বাংলাদেশের মধ্যযুগীয় স্থাপত্য ও সনাতন শিল্পকলার অনন্য নিদর্শন হিসেবেও স্বীকৃত।

১৭২২ খ্রিস্টাব্দে দিনাজপুরের সমৃদ্ধ জমিদার মহারাজা প্রাণনাথ রায় এই মন্দিরের নির্মাণ কাজ শুরু করেন। তাঁর ইচ্ছা ছিল শ্রীকৃষ্ণের প্রতি ভক্তি ও আরাধনার জন্য একটি মহৎ স্থাপন নির্মাণ করা। প্রাণনাথ রায়ের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র মহারাজা রামনাথ রায় এই কাজটি সম্পূর্ণ করেন এবং ১৭৫২ বা ১৭৫৪ খ্রিস্টাব্দে মন্দিরটি সম্পন্ন হয়।


 স্থাপত্যে নির্মিত হয়েছিল, যা ১৮৯৭ সালের একটি ভয়ানক ভূমিকম্পে ধ্বংস হয়ে যায়। সেই সময়ে মন্দিরের সে সৌন্দর্য হারিয়ে গেলেও মূল কাঠামো ও টেরাকোটার শিল্প আজও দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে।

দিনাজপুর শহর থেকে প্রায়  ২১ কি:মি: উত্তর দিকে, কাহারোল উপজেলার সুন্দরপুর ইউনিয়নের কান্তনগর গ্রামে এই মন্দির অবস্থিত। ঢেপা নদীর তীরে স্থাপিত হওয়ায় শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে প্রকৃতির কোলে দাঁড়িয়ে এটি ইতিহাস ও ধর্মীয় চেতনার এক সৌধ

কান্তজিউ মন্দির বাংলাদেশের টেরাকোটা স্থাপত্যের শ্রেষ্ঠ উদাহরণগুলির মধ্যে একটি। মন্দিরটি মূলত ইট ও টেরাকোটা পাথরে নির্মিত, যার দেয়ালে ১৫,000-এরও বেশি টেরাকোটা প্লেক রয়েছে। এই পাট্টাগুলিতে রামায়ণ, মহাভারত, শ্রীকৃষ্ণের জীবনী, হিন্দু দেবতার আগমন এবং প্রাচীন সমাজজীবনের বিভিন্ন দৃশ্য চিত্রিত করা হয়েছে — যা প্রায় জীবন্ত গল্প জানায়। 

মন্দিরটির সম্মুখভাগে কেটে তৈরি বিভিন্ন উপাখ্যান ও মানবচিত্রে ১৮শ শতাব্দীর সমাজের সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ও দৈনন্দিন জীবনের ছবি প্রতিফলিত হয় — যেন সময়ের ক্যানভাসে খানিকটা ইতিহাস বেঁধে রাখা হয়েছে।

মন্দিরটি শ্রীকৃষ্ণ ও তাঁর স্ত্রী রুক্মিণীকে উৎসর্গীকৃত। এটি হিন্দুধর্মাবলম্বীদের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান হিসেবেও বিবেচিত হয় এবং প্রতিদিন অনেকে এখানে ভক্তি ও পূজায় অংশ নেন।

বিশেষ করে 'রাস মেলা', যা প্রতি বছরের নভেম্বর মাসে মন্দির প্রাঙ্গণে আয়োজিত হয়, ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক প্রদর্শনীতে পরিপূর্ণ। হাজার হাজার ভক্ত ধারাবাহিকভাবে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন এবং এই মেলায় সামাজিক ঐক্য ও সাংস্কৃতিক সৌন্দর্য উজ্জ্বলভাবে ফুটে ওঠে। 

মন্দিরটি বাংলাদেশের স্থাপত্যপ্রেমী, ইতিহাসাভিযাত্রী, ধর্মীয় ভ্রমণপিপাসু— সকলেই এখানে এসে তার নিখুঁত শিল্পকর্ম, প্রবল আর্কিটেকচারাল ফর্ম ও সময়ের সাক্ষী টেরাকোটার নিদর্শন দেখে বিস্মিত হন। 

এটি বর্তমানে বাংলাদেশের সরকার কর্তৃক  সংরক্ষিত ঐতিহাসিক স্মৃতি* হিসেবে সংরক্ষিত রয়েছে এবং প্রতিদিন পর্যটক ও পুরোহিতদের আনাগোনা থাকে।

কান্তজিউ মন্দির শুধুমাত্র একটি প্রাচীন হিন্দু মন্দির নয়; এটি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, শিল্পকলার এক জীবন্ত ইতিহাস এবং ধর্মীয় ভাবাবেগের এক অনন্য প্রকাশ। প্রতিটি ইট ও টেরাকোটা পাথর যেন সেদিনকার সমাজ, ধর্ম ও কল্পনার গল্প বলে। এই মন্দির আমাদের অতীতকে স্মরণ করিয়ে দেয় — যেখানে ধর্ম, শিল্প ও মানবিকতা একসাথে গাঁথা ছিল।