ভাগ্যের জোরে আর্জেন্টিনা, কষ্টার্জিত জয়ে শেষ ষোলয় মিশর ও কলম্বিয়া
ক্রীড়া প্রতিবেদক:
বিশ^কাপে সেরা ৩২ এর খেলায় কেপ ভার্দের বিপক্ষে ম্যাচটি ছিল কোচ হিসেবে লিওনেল স্কালোনির শততম ম্যাচ। এই ম্যাচটি কোনভাবেই হারতে চাননি এই আর্জেন্টাইন। বিশ^কাপে নবাগত প্রতিপক্ষ রীতিমতো নাকানি চুবানি খাইয়ে ছেড়েছে বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের। শেষ পর্যন্ত আত্বঘাতিক গোলের উপর ভর করে অতিরিক্ত সময়ে ৩-২ গোলে জিতে কোনরকমে শেষ ষোলয় স্থান করে নিয়েছে লিওনেল মেসির দল। দিনের অপর খেলায় অস্ট্রেলিয়াকে টাইব্রেকারে ৪-২ গোলে হারিয়ে প্রথমবারের মতো সেরা ১৬ তে এখন মিশর। অন্যদিনে দিনের শেষ খেলায় ঘানাকে ১-০ গোলে হারিয়ে ল্যাটিনের দল হিসেবে নক আউটে জায়গা করে নিয়েছে কলম্বিয়া। একদিন তিন রোমাঞ্চকর ম্যাচের স্বাক্ষী হয়েছে বিশ^কাপ ফুটবল। সবচেয়ে বড় কথা যে কেপ ভার্দে প্রথমবারের মতো বিশ^কাপে খেলছে তারাই রাতের ঘুম হারাম করে ছেড়েছে আর্জেন্টিনার। স্বস্থির বিষয় হলো ম্যাচটা তারা হারেনি।
অঘটন থেকে রক্ষা পেয়েছে আর্জেন্টিনা!
লিওনেল মেসি যেন পুরো যৌবনা হয়ে অবির্ভুত হয়েছেন। এই ম্যাচে তার গোলও জয়ের জন্য যথেষ্ট ছিল না। বিশ্বকাপের নবাগত কেপ ভার্দে অবিশ্বাস্য লড়াইয়ে দুইবার সমতায় ফিরে এসে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে কঠিন পরীক্ষায় ফেলে দিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত সময়ে প্রতিপক্ষের আত্মঘাতী গোলে ৩-২ ব্যবধানে জয় তুলে নিয়ে শেষ ষোলো নিশ্চিত করে আর্জেন্টিনা। এর মাধ্যমে বড় অঘটন থেকেও রক্ষা পায় আলবি সেলেস্তেরা। বিশ্বকাপে প্রথমবার অংশ নেওয়া আফ্রিকার দেশটি মায়ামি স্টেডিয়ামে ৬৪ হাজার ৪৭৮ দর্শকের সামনে দুইবার পিছিয়ে পড়েও সমতায় ফিরে এসে চমকে দিয়েছিল অধিকাংশ সমর্থককে। অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয়ার্ধ শুরুর ছয় মিনিট পর লিওনেল মেসির নেওয়া কর্নার থেকে ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো হেড করেন। বলটি কেপ ভার্দের সেন্টার-ব্যাক ডিনে বোর্জেসের হাতে লেগে জালে জড়িয়ে যায়। সেই আত্মঘাতী গোলেই শেষ পর্যন্ত আগামী মঙ্গলবার আটলান্টায় মিসরের বিপক্ষে শেষ ষোলোর লড়াই নিশ্চিত হয় আর্জেন্টিনার। ম্যাচের ২৯তম মিনিটে চলতি বিশ্বকাপে নিজের সপ্তম গোল করে আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে দেন মেসি।
তবে ঘণ্টার কাঁটা এক ঘণ্টার কাছাকাছি পৌঁছানোর আগেই সমতা ফেরান দিরয় দুয়ার্তে। নির্ধারিত সময়ে সমতা ধরে রেখে ম্যাচকে অতিরিক্ত সময়ে নিয়ে যায় ‘ব্লুু শার্কস’ খ্যাত দলটি। অতিরিক্ত সময়ের প্রথমার্ধের দ্বিতীয় মিনিটে লিসান্দ্রো মার্তিনেস দারুণ এক শটে আবারও আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে দেন। যদিও সেখানেও হার মানেনি কেপ ভার্দে। ম্যাচের ১০৩তম মিনিটে বাঁ প্রান্তের ডিফেন্ডার সিডনি লোপেস কাবরাল অসাধারণ বাঁকানো শটে বল জালে জড়িয়ে আবারও স্কোরলাইন ২-২ করেন। রোমেরোর হেড থেকে হওয়া আত্মঘাতী গোলের পরও সমতায় ফেরানোর সুযোগ পেয়েছিল কেপ ভার্দে। তবে লোপেস কাবরালের নেওয়া দারুণ ফ্রি-কিক অসাধারণ দক্ষতায় ঠেকিয়ে দেন আর্জেন্টাইন গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেস। ম্যাচের শেষ মুহূর্তগুলোতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সেভ করে দলকে জয় এনে দিতে বড় ভূমিকা রাখেন তিনি। হেরে গেলেও তিনবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে কোনো অংশেই ম্লান ছিল না কেপ ভার্দে। নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপেই দলগত সমন্বয়, লড়াকু মানসিকতা ও দৃঢ়তার আরেকটি দুর্দান্ত প্রদর্শনী উপহার দেয় আফ্রিকার দলটি। বিশ্বকাপে অভিষেক হওয়া চার দলের মধ্যে একমাত্র দল হিসেবে শেষ ৩২-এ জায়গা করে নেওয়া এবং টুর্নামেন্ট শুরুর আগে ফিফা র্যাঙ্কিয়ে ৬৭ নম্বরে থাকা কেপ ভার্দে আশা করেছিল।
প্রথমবার শেষ ষোলতে মিশর
প্রথমবারের মতো নকআউটে খেলতে নেমেই বাজিমাত, অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে নতুন ইতিহাস গড়ল মিসর। ১৯৩৪, ১৯৯০, ২০১৮ সাল, এই তিনবার মিশর বিশ্বকাপ খেলেছে আর প্রতিবারই টুর্নামেন্টের গ্রুপ পর্ব থেকে ছিটকে যেতে হয়েছিল। এবার অতীত ইতিহাস বদলে ফেলল মোহাম্মেদ সালাহর দল। প্রায় এক শতাব্দীর অপেক্ষার অবসান ঘটাল মিসর। ১৯৩৪ সালে প্রথমবার বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার পর দীর্ঘ ৯২ বছর ধরে প্রতিবারই গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিতে হয়েছিল আফ্রিকার দেশটিকে। তবে ২০২৬ বিশ্বকাপে সেই ইতিহাস বদলে দিলেন সালাহরা। রাউন্ড অব ৩২-এ অস্ট্রেলিয়াকে টাইব্রেকারে ৪-২ গোলে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের শেষ ষোলো নিশ্চিত করল মিসর। তিন ঘণ্টার টান টান লড়াই চলল। নির্ধারিত ৯০ মিনিটে ম্যাচ ১-১ গোলে শেষ হয়। অতিরিক্ত ৩০ মিনিটেও কোনও দল ব্যবধান গড়তে না পারায় ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে। সেখানে গোলমাল করে বসে অস্ট্রেলিয়া। এরপরই ইতিহাস গড়ার বুনো আনন্দে মেতে ওঠেন মিসরের ফুটবলাররা।
ঘানাকে হারিয়ে শেষ ষোলোয় কলম্বিয়া
আফ্রিকা ল্যাটিন আমেরিকার লড়াইয়ে জয় হয়েছে ল্যাটিনের। ঘানাকে ১-০ গোলে কলম্বিয়াকে হারিয়ে শেষ ষোলয় জায়গা করে নিয়েছে। ম্যাচের ১৪তম মিনিটে পাওয়া গোলই শেষ পর্যন্ত গড়ে দিল জয়ের ভিত। এরপর একের পর এক সুযোগ তৈরি করেও ব্যবধান বাড়াতে পারেনি কলম্বিয়া। তবে গোটা ম্যাচে নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে ঘানাকে ১-০ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপের শেষ ষোলো নিশ্চিত করেছে দক্ষিণ আমেরিকার দলটি। এই জয়ে প্রত্যাশিতভাবেই শেষ ষোলোতে জায়গা করে নিয়েছে কলম্বিয়া, যেখানে তাদের প্রতিপক্ষ সুইজারল্যান্ড। ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে কলম্বিয়া। তবে প্রথম কোয়ার্টারেই চোটের কারণে ধাক্কা খেতে হয় দুই দলকেই। কলম্বিয়ার স্ট্রাইকার জন কর্ডোবা এবং ঘানার ডিফেন্ডার মারভিন সেনায়া ইনজুরিতে মাঠ ছাড়লে শুরুতেই পরিকল্পনা বদলাতে বাধ্য হন দুই কোচ। ম্যাচের ১৪ মিনিটের মাথায় আসে কাঙ্খিত সেই গোল। লুইস সুয়ারেজের পাস থেকে লুইস দিয়াজ বল বাড়িয়ে দেন বক্সের ভেতরে থাকা জন আরিয়াসের দিকে। দারুণ প্রথম স্পর্শে নেওয়া নিখুঁত ফিনিশিংয়ে বল জালে জড়িয়ে বায়ার্ন মিউনিখের এই উইঙ্গার কলম্বিয়াকে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে দেন।