অ্যামাজনের ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মামলা ব্রাজিলের সুপ্রিম কোর্টে, নজর পুরো বিশ্বের
শাহনুর রুমেন | ব্রাজিল প্রতিনিধি:
বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত অঞ্চলগুলোর একটি অ্যামাজন রেইনফরেস্টের ভবিষ্যৎ এবং ব্রাজিলের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমির অধিকার নিয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মামলার শুনানি চলছে দেশটির সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম ফেডারেল কোর্টে (STF)। আগামী কয়েক দিনের এসব মামলার সিদ্ধান্ত অ্যামাজনের পরিবেশ সুরক্ষা, বন উজাড় নিয়ন্ত্রণ এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমির অধিকারকে দীর্ঘমেয়াদে প্রভাবিত করতে পারে। ফলে ব্রাজিলের আদালতের দিকে এখন নজর পরিবেশবাদী ও আন্তর্জাতিক মহলের।
মামলাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো আদিবাসী ভূমি নির্ধারণের ক্ষেত্রে বহুল বিতর্কিত ‘মার্কো টেম্পোরাল’ বা ‘টাইম লিমিট থিওরি’। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, ১৯৮৮ সালের ৫ অক্টোবর ব্রাজিলের বর্তমান সংবিধান কার্যকর হওয়ার সময় যে আদিবাসী জনগোষ্ঠী কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে বসবাস করছিল, মূলত সেই ভূমির দাবিকেই স্বীকৃতি দেওয়ার কথা বলা হয়। আদিবাসী সংগঠনগুলোর অভিযোগ, এই নিয়ম ঐতিহাসিকভাবে উচ্ছেদ বা জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হওয়া জনগোষ্ঠীর অধিকারকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। অন্যদিকে কৃষি ও ভূমিমালিকদের একটি অংশ বলছে, নির্দিষ্ট সময়সীমা ভূমির মালিকানা নিয়ে দীর্ঘদিনের আইনি অনিশ্চয়তা কমাতে পারে। ব্রাজিলের সুপ্রিম কোর্ট ২০২৫ সালে এই ‘টাইম লিমিট’ তত্ত্ব প্রত্যাখ্যান করেছিল। তবে সেই সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা ও বাস্তবায়ন নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের করা আবেদন এখনো আদালতের সামনে রয়েছে। এসব বিষয়ে বিচারপতিদের ভোট দেওয়ার সময়সীমা ১৮ আগস্ট পর্যন্ত নির্ধারিত রয়েছে। আদালতের সিদ্ধান্ত বিশেষ করে অ্যামাজনের আদিবাসী জনগোষ্ঠীগুলোর ভূমি অধিকার ও ভবিষ্যৎ ভূমি চিহ্নিতকরণ প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।এর পাশাপাশি আদালতের সামনে রয়েছে অ্যামাজনের ‘সয়া মরাটোরিয়াম’ বা Soy Moratorium-সংক্রান্ত মামলাও। প্রায় দুই দশক ধরে চলা এই উদ্যোগের আওতায় বড় সয়া ব্যবসায়ীরা বন উজাড় করে তৈরি করা জমি থেকে উৎপাদিত সয়া কেনা থেকে বিরত থাকার নীতি অনুসরণ করে আসছিল। পরিবেশবাদীদের মতে, অ্যামাজনে বন উজাড় কমাতে এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে সয়া উৎপাদনকারী কয়েকটি রাজ্য ও কৃষি খাতের প্রতিনিধিদের সঙ্গে এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছে। আগামী বুধবার এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টে গুরুত্বপূর্ণ শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মামলা নতুন পরিবেশগত লাইসেন্সিং আইনকে ঘিরে। আইনটির মাধ্যমে মহাসড়ক, খনি ও অন্যান্য কৌশলগত অবকাঠামো প্রকল্পের অনুমোদন প্রক্রিয়া দ্রুত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। পরিবেশবাদীদের আশঙ্কা, এর ফলে পরিবেশগত যাচাই ও নিয়ন্ত্রণের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে যেতে পারে। ব্রাজিলের পরিবেশ মন্ত্রণালয়ও আইনটির কিছু বিধান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং পরিবেশ সুরক্ষার ন্যূনতম জাতীয় মান বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছে।
অ্যামাজন শুধু ব্রাজিলের সম্পদ নয়, বৈশ্বিক জলবায়ু ব্যবস্থার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের বৃহত্তম এই রেইনফরেস্ট বিপুল পরিমাণ কার্বন ধারণ করে এবং বৃষ্টিপাত ও জলবায়ুর ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে বিশাল এই বনাঞ্চল বহু আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আবাসস্থল। ফলে অ্যামাজনের বন, ভূমি ও প্রাকৃতিক সম্পদ নিয়ে ব্রাজিলের যেকোনো বড় আইনি সিদ্ধান্তের প্রভাব দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক জলবায়ু নীতি ও পরিবেশ সুরক্ষার ওপরও পড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্রাজিলের কংগ্রেসে পরিবেশ সুরক্ষা নিয়ে রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই সুপ্রিম কোর্ট এখন গুরুত্বপূর্ণ এক ভারসাম্য রক্ষাকারীর ভূমিকায় উঠে এসেছে। আদালতের সামনে থাকা মামলাগুলোর সিদ্ধান্ত তাই শুধু আইনি লড়াইয়ের ফলাফল নয়; বরং অ্যামাজন রেইনফরেস্ট, আদিবাসী অধিকার এবং ব্রাজিলের ভবিষ্যৎ পরিবেশনীতি কোন পথে এগোবে, তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিতে পারে।