সুন্দরবন–বঙ্গোপসাগর ঘিরে খুলনায় নীল অর্থনীতির নতুন সম্ভাবনা

 প্রকাশ: ২৮ অগাস্ট ২০২৬, ০১:২০ অপরাহ্ন   |   খুলনা

সুন্দরবন–বঙ্গোপসাগর ঘিরে খুলনায় নীল অর্থনীতির নতুন সম্ভাবনা


খুলনা ব্যুরো :

সুন্দরবন, উপকূলীয় নদ-নদী ও বঙ্গোপসাগর—একটি অঞ্চলের ভৌগোলিক পরিসরে এমন বৈচিত্র্য বাংলাদেশের আর কোথাও নেই। এই বৈচিত্র্যকে কাজে লাগিয়ে মৎস্য ও সামুদ্রিক সম্পদ, জলজ কৃষি, জীবপ্রযুক্তি এবং পরিবেশ সংরক্ষণকে একসূত্রে এনে খুলনা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নীল অর্থনীতির (ব্লু ইকোনমি) গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে বলে মনে করছেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্য ও সামুদ্রিক সম্পদ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মো. নাজমুল আহসান।

তাঁর মতে, বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের বিশাল সমুদ্রসীমা থাকলেও এর অর্থনৈতিক সম্ভাবনার বড় অংশ এখনো অনাবিষ্কৃত। শুধু মাছ আহরণ নয়, সমুদ্রের জীববৈচিত্র্য, সামুদ্রিক জলজ চাষ, শৈবাল, কাঁকড়া, ঝিনুক, সামুদ্রিক জীবপ্রযুক্তি এবং পরিবেশগত সেবাকে অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। এ জন্য গবেষণা, দক্ষ জনবল ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনার বিকল্প নেই।

খুবি'র অধ্যাপক ড. মো. নাজমুল আহসানের গবেষণার ক্ষেত্রের মধ্যে মৎস্য ব্যবস্থাপনা, জলজ উৎপাদন ও জীবপ্রযুক্তি রয়েছে। তিনি মনে করেন, খুলনার ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এ ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিতে পারে।

সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নির্ভরযোগ্য তথ্যের ঘাটতি। সমুদ্রে কোন প্রজাতির মাছ কত আছে, কোথায় তাদের বিচরণ ও প্রজননক্ষেত্র, কোন সময়ে কতটা আহরণ করা নিরাপদ—এসব তথ্য ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে মৎস্যসম্পদ রক্ষা করা সম্ভব নয়।

এ জন্য স্যাটেলাইট চিত্র, জিআইএস, পরিবেশগত ডিএনএ (eDNA), সমুদ্রবিজ্ঞানভিত্তিক মডেলিং এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে একটি সমন্বিত তথ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন অধ্যাপক নাজমুল আহসান।

তাঁর মতে, তথ্যনির্ভর ব্যবস্থাপনা চালু হলে একদিকে যেমন অতিরিক্ত মাছ আহরণ কমানো যাবে, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সামুদ্রিক সম্পদ সংরক্ষণও সম্ভব হবে।

বাংলাদেশের সামুদ্রিক মৎস্য আহরণ এখনো মূলত উপকূলীয় এলাকার ওপর নির্ভরশীল। অথচ গভীর সমুদ্রে টুনাসহ বিভিন্ন বড় পেলাজিক মাছের সম্ভাবনা রয়েছে। এসব সম্পদের মজুত নিরূপণ, আধুনিক আহরণ পদ্ধতি এবং সংরক্ষণব্যবস্থা নিয়ে গবেষণা বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।

এ ক্ষেত্রে শুধু মাছ ধরার প্রযুক্তি নয়, দক্ষ জেলে, আধুনিক নৌযান, মাছ সংরক্ষণ এবং কোল্ড-চেইন ব্যবস্থাপনার উন্নয়নও জরুরি। এসব অবকাঠামো গড়ে উঠলে সামুদ্রিক মৎস্য খাতের অর্থনৈতিক পরিসর আরও বাড়তে পারে।

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতিতে চিংড়ির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তবে জলবায়ু পরিবর্তন, লবণাক্ততার ওঠানামা ও রোগবালাইয়ের কারণে একই ধরনের উৎপাদনব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল না থেকে মেরিকালচারে বৈচিত্র্য আনার প্রয়োজন রয়েছে।

সি-বাস, গ্রুপার, কাঁকড়া, ঝিনুক, সামুদ্রিক শৈবাল ও সি-কিউকাম্বারের মতো উচ্চমূল্যের সামুদ্রিক প্রাণী ও উদ্ভিদের চাষ নিয়ে গবেষণা বাড়ানো যেতে পারে। উপকূলীয় মানুষের জন্য এসব নতুন জলজ কৃষি বিকল্প আয়ের পথ তৈরি করতে পারে।

নীল অর্থনীতির আলোচনায় সুন্দরবনকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। এই বন উপকূলকে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের আঘাত থেকে সুরক্ষা দেয়। পাশাপাশি এটি মাছসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণীর প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র এবং বিপুল পরিমাণ কার্বন ধরে রাখে।

অধ্যাপক নাজমুল আহসানের মতে, সুন্দরবনের এসব পরিবেশগত সেবার অর্থনৈতিক মূল্য নির্ধারণ করা প্রয়োজন। এতে বন সংরক্ষণের গুরুত্ব অর্থনৈতিকভাবেও স্পষ্ট হবে। একই সঙ্গে সংরক্ষণ ও জীবিকার মধ্যে ভারসাম্য তৈরির পথ বের করা সহজ হবে।

সমুদ্রের জীববৈচিত্র্য শুধু মাছের উৎস নয়। বিভিন্ন সামুদ্রিক অণুজীব, উদ্ভিদ ও প্রাণী থেকে ওষুধ, প্রসাধনী, খাদ্য উপাদান এবং শিল্পে ব্যবহারের উপযোগী এনজাইমসহ উচ্চমূল্যের পণ্য তৈরির সুযোগ রয়েছে।

এ জন্য মৎস্যবিজ্ঞানের সঙ্গে জীবপ্রযুক্তি, মাইক্রোবায়োলজি ও জিনোমিক্সের সমন্বয় ঘটাতে হবে। এতে কাঁচা সামুদ্রিক পণ্য রপ্তানির পরিবর্তে দেশে মূল্য সংযোজন করে উচ্চমূল্যের পণ্য তৈরির সুযোগ তৈরি হবে।

নীল অর্থনীতির সুফল পেতে শুধু গবেষণা করলেই হবে না, গবেষণার ফল মাঠপর্যায়ে নিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাছ ধরা, হ্যাচারি, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সামুদ্রিক জলজ চাষের বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করার প্রয়োজন রয়েছে।

সামুদ্রিক শৈবাল চাষ, মেরিন বায়োটেকনোলজি, ইকো-ট্যুরিজম, কোল্ড-চেইন ও সামুদ্রিক পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের মতো খাতে নতুন উদ্যোক্তা তৈরির সুযোগ রয়েছে। এতে চাকরির পাশাপাশি উদ্যোক্তা তৈরির পথও খুলবে।

সুন্দরবন ও বঙ্গোপসাগরের মাঝামাঝি অবস্থানের কারণে খুলনাকে নীল অর্থনীতির গবেষণাগার হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। মিঠাপানি, মোহনা, উপকূল ও সমুদ্র—এই চার ধরনের পরিবেশকে একই গবেষণা কাঠামোর আওতায় আনা গেলে জলবায়ু পরিবর্তন, মৎস্যসম্পদ ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য নিয়ে সমন্বিত গবেষণা সম্ভব হবে।

অধ্যাপক ড. মো. নাজমুল আহসান মনে করেন, এ কাজে বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি প্রতিষ্ঠান, গবেষণা সংস্থা ও বেসরকারি খাতকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়, পুরো দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলকে কেন্দ্র করে গবেষণা ও উদ্ভাবনের একটি আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা যেতে পারে।

তাঁর মতে, বাংলাদেশের নীল অর্থনীতির সম্ভাবনা বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও দক্ষ জনবল। সুন্দরবন ও বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে খুলনার যে প্রাকৃতিক সুবিধা রয়েছে, তা কাজে লাগাতে পারলে মৎস্য ও সামুদ্রিক সম্পদ শুধু খাদ্য ও জীবিকার উৎস নয়, ভবিষ্যতের বড় অর্থনৈতিক শক্তিতেও পরিণত হতে পারে।