খুলনায় পুলিশ কর্মকর্তা তৈমুরের গড়ে তোলা ক্রাইমের রাজ্যে
খুলনা ব্যুরো ও ক্রাইম রিপোর্টার:
খুলনার অপরাধ ও ক্ষমতার নেপথ্য চিত্র অনুসন্ধান করতে গিয়ে বারবার উঠে এসেছে এক পুলিশ কর্মকর্তার নাম—তৈমুর ইসলাম। বর্তমানে তিনি খুলনা মহানগর পুলিশের (কেএমপি) গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) পরিদর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তবে স্থানীয় বাসিন্দা, ভুক্তভোগী এবং পুলিশের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন সূত্রের ভাষ্য বলছে, তাঁর ভূমিকা শুধু একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং মামলা, গ্রেপ্তার, ভয়ভীতি প্রদর্শন, অর্থ আদায় এবং প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে তিনি খুলনায় একটি শক্তিশালী প্রভাববলয় গড়ে তুলেছেন।
সম্প্রতি তাঁর কর্মকাণ্ড নিয়ে কথা বলেছেন অন্তত
১৩ জন ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি। তাঁদের অধিকাংশই পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক। কারণ
হিসেবে তাঁরা জানিয়েছেন, তৈমুর ইসলামের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অভিযোগ করলে প্রশাসনিক হয়রানি
কিংবা মামলার মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যবসা বা সম্পত্তি দখলের বিরোধে এক পক্ষকে সুবিধা দিতে পুলিশি প্রভাব ব্যবহার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারের ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়, মামলায় জড়ানোর হুমকি এবং অপরাধী চক্রের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার অভিযোগও তুলেছেন তাঁরা।
অন্যদিকে, দুর্নীতি দমন কমিশনের সমন্বিত জেলা
কার্যালয় খুলনায় পুলিশ পরিদর্শক তৈমুর ইসলাম এবং তার স্ত্রী মিসেস মনিরা খানম এর বিরুদ্ধে
জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ তদন্তাধীন।
দীর্ঘদিনের
স্থানীয় সংযোগ
২০২৪ সালের ৩ নভেম্বর কেএমপিতে যোগ দেন তৈমুর
ইসলাম। এরপর থেকেই তিনি ডিবির ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। খুলনার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক
বহু পুরোনো। সরকারি নথি অনুযায়ী তাঁর স্থায়ী ঠিকানা খুলনা সদর এলাকায়। শিক্ষা জীবনও
কেটেছে খুলনার আজম খান সরকারি কমার্স কলেজে। চাকরিজীবনের একটি বড় অংশও তিনি এই অঞ্চলে
কাটিয়েছেন।
স্থানীয় পর্যায়ে দীর্ঘদিনের অবস্থান এবং প্রশাসনিক
যোগাযোগের কারণে পুলিশের ভেতরে ও বাইরে তাঁর একটি আলাদা নেটওয়ার্ক তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ
রয়েছে।
বেনজীর-ঘনিষ্ঠ
পরিচয়ের আলোচনায়
পুলিশের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, সাবেক আইজিপি
বেনজীর আহমেদের ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তা হিসেবেও বাহিনীতে পরিচিত ছিলেন তৈমুর ইসলাম। বেনজীর
আহমেদের গোপালগঞ্জের সাভানা ইকোরিসোর্ট অ্যান্ড ন্যাচারাল পার্ক প্রকল্পের জন্য জমি
অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ায় তাঁর সম্পৃক্ততার অভিযোগও অতীতে আলোচনায় আসে।
ওই এলাকায় জমি হারানো পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ
ছিল, জমি বিক্রির জন্য তাঁদের ওপর বিভিন্ন ধরনের চাপ প্রয়োগ করা হয়েছিল। যদিও এসব অভিযোগ
বরাবরই অস্বীকার করে আসছেন তৈমুর ইসলাম।
বদলির
আদেশেও বহাল অবস্থান
তৈমুর ইসলামকে ঘিরে বিতর্ক শুধু স্থানীয় অভিযোগেই
সীমাবদ্ধ নয়। পুলিশের অভ্যন্তরীণ নজরদারি ইউনিটের প্রতিবেদনে তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন
অনিয়মের বিষয় উঠে আসে বলে জানা গেছে। পরবর্তীতে অনুসন্ধানের ভিত্তিতে তাঁকে অন্য ইউনিটে
বদলির সুপারিশও করা হয়।
২০২৪ সালের ১৬ অক্টোবর তাঁকে ট্যুরিস্ট পুলিশে
বদলির আদেশ দেওয়া হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নতুন কর্মস্থলে যোগ না দিলে স্ট্যান্ড
রিলিজ হিসেবে গণ্য হওয়ার কথাও উল্লেখ ছিল আদেশে। তবে তিনি বদলি বাতিলের আবেদন করেন
এবং পরবর্তী সময়ে নতুন আদেশে তাঁকে খুলনা রেঞ্জে পদায়ন করা হয়।
এরপরও তিনি কেএমপি ছাড়েননি। শেষ পর্যন্ত চলতি
বছরের মার্চে সেই বদলির আদেশও বাতিল হয়ে যায়। ফলে একাধিক প্রশাসনিক আদেশ জারির পরও
তিনি আগের কর্মস্থলেই বহাল থাকেন।
‘তদবিরে
আটকে যায় বদলি’—অভিযোগ
পুলিশ সদর দপ্তরের একাধিক সূত্রের দাবি, তৈমুর
ইসলামের বদলি কার্যকর না হওয়ার পেছনে প্রভাবশালী মহলের তদবির কাজ করেছে। বাহিনীর প্রচলিত
নীতিমালায় সাধারণত কর্মকর্তাদের নিজ জেলা বা নিজ এলাকার কর্মস্থলে পদায়ন নিরুৎসাহিত
করা হলেও তাঁর ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ঘটেছে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এবং বদলির আদেশ বাস্তবায়ন
না হওয়ার বিষয়টি এখন প্রশাসনিক মহলেও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
অতিরিক্ত
আইজিপির প্রতিক্রিয়া
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি
(প্রশাসন) এ কে এম আওলাদ হোসেন বলেন, সংশ্লিষ্ট ফাইল না দেখে তিনি কোনো মন্তব্য করতে
পারবেন না।
পরবর্তীতে যোগাযোগের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, তিনি ব্যস্ত রয়েছেন এবং পরে যোগাযোগের প্রয়োজন নেই। তাঁর স্বাক্ষরে জারি হওয়া একাধিক আদেশের প্রসঙ্গ তুললে তিনি সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়ায় বলেন, “আমার মতামত নিয়ে আপনার কী হবে?”