সংবাদ শিরোনাম

ভূমিদস্যুদের দখল আতঙ্কে মাথাভাঙ্গা মৌজার ৩২ পরিবার

 প্রকাশ: ১৪ জানুয়ারী ২০২৬, ০৬:৩৯ অপরাহ্ন   |   খুলনা

ভূমিদস্যুদের দখল আতঙ্কে মাথাভাঙ্গা মৌজার ৩২ পরিবার

খুলনা ব্যুরো :

খুলনা নগরীর উপকণ্ঠে মাথাভাঙ্গা মৌজায় বসবাসকারী ৩২টি দরিদ্র পরিবার এখন চরম দখল আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। দীর্ঘদিনের বসতভিটা হারানোর আশঙ্কায় তারা মানবেতর জীবনযাপন করছে। অভিযোগ উঠেছে, মো. আল মামুন নামের এক ব্যক্তি ‘ইউনিভার্সাল প্রোপার্টিজ’-এর ব্যানারে ওই এলাকার জমি দখলের চেষ্টা চালাচ্ছেন।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, জমির চারপাশে একাধিক সাইনবোর্ড টাঙিয়ে এবং সার্বক্ষণিক লোক বসিয়ে প্রকৃত মালিকদের হুমকি-ধমকি দেওয়া হচ্ছে। এতে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন এলাকাবাসী।

৭০ বছর বয়সী জাবেরুন নেছা সারাজীবন রাজমিস্ত্রির সহকারী হিসেবে কাজ করে উপার্জিত অর্থ দিয়ে নিজের নামে এক কাঠা এবং ছেলের নামে দুই কাঠা জমি কিনেছিলেন। প্রায় ১৭ বছর আগে কেনা সেই জমিতে বসবাস করলেও এখন তিনি উৎখাতের আশঙ্কায় ভুগছেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “এই বয়সে ঘর ছাড়লে আমি কোথায় যাব?”

শুধু জাবেরুন নেছাই নন, মাথাভাঙ্গা মৌজার ৩২টি পরিবারই একই অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। অধিকাংশ বাসিন্দা গৃহকর্মী, দিনমজুর কিংবা স্বল্প আয়ের মানুষ। অনেকেই নিজেদের শেষ সম্বল বিক্রি করে এখানে বসত গড়েছিলেন।

স্থানীয়রা জানান, রূপসা সেতুর কাছাকাছি হওয়ায় একসময়ের জলাভূমি মাথাভাঙ্গা মৌজা এখন ভূমিদস্যুদের নজরে পড়েছে। প্রায় তিন একর জমির ওপর ৩২টি পরিবার দুই থেকে পাঁচ কাঠা করে জমি কিনে বাড়িঘর নির্মাণ করে বসবাস করছে। নিয়মিত খাজনা ও ট্যাক্সও পরিশোধ করছেন তারা। অথচ হঠাৎ করেই এক ব্যক্তি দাবি করছেন, ওই এলাকার সব জমি তিনি কিনে নিয়েছেন।

এ ঘটনায় এসএ ১৬৫ খতিয়ানের ১.৪০৭৬২৫ একর জমির ৩২ জন প্লট মালিকের পক্ষে আবদুল মান্নান গত ৩১ ডিসেম্বর লবণচরা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। জিডিতে উল্লেখ করা হয়, ১৯৯১ সালে একটি পক্ষ হাইকোর্ট থেকে একতরফা ডিক্রি নিলেও ২০২৪ সালের ২ জুন হাইকোর্টের সিভিল রিভিশন বিভাগ ওই ডিক্রি স্থগিত করে জমির দখল বিষয়ে স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশ দেন। অভিযোগ রয়েছে, আদালতের আদেশ অমান্য করে গত ২৯ ডিসেম্বর আল মামুন ও তাঁর সহযোগীরা এলাকাবাসীকে জীবননাশের হুমকি দেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৭১ সাল পর্যন্ত রামচরণ মণ্ডল ছিলেন ওই খতিয়ানের ২.৯৮ একর জমির মালিক। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় দেশত্যাগের পর জমিটি পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়। পরে ১৯৭২ সালে বন্দোবস্ত নিয়ে একাধিকবার হাতবদলের পর বর্তমান বাসিন্দারা জমি কিনে বসবাস শুরু করেন।

মিনারা মসজিদের মোয়াজ্জেম বলেন, “পৈতৃক জমি বিক্রি করে এখানে বসত গড়েছি। এখন সাইনবোর্ড লাগিয়ে আমাদের উঠিয়ে দিতে চায়। পরিবার নিয়ে কোথায় যাব?” একই আশঙ্কা প্রকাশ করেন বিধবা লাইলী বেগমও।

তবে জমি দখলের অভিযোগ অস্বীকার করে ইউনিভার্সাল প্রোপার্টিজের স্বত্বাধিকারী আল মামুন বলেন, “আমি ওই জমির প্রকৃত মালিক। কেউ বৈধ কাগজ দেখাতে পারলে ক্ষতিপূরণ দিয়ে বিষয়টি মীমাংসা করব।”

লবণচরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. তুহিনুজ্জামান বলেন, “লিখিত অভিযোগ আদালতে পাঠানো হয়েছে। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

এদিকে ভূমিহীন হয়ে পড়ার আশঙ্কায় থাকা পরিবারগুলো দ্রুত প্রশাসনের হস্তক্ষেপ এবং আদালতের আদেশ কার্যকরের দাবি জানিয়েছেন। তারা বলছেন, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে যে কোনো সময় বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয় ঘটতে পারে।