বাকির খাতা থেকে রক্তের দাগ: টাঙ্গাইলে মাইকে অস্ত্র নিয়ে জড়ো হওয়ার ঘোষণায় চরম আতঙ্ক

 প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ০৮:০২ পূর্বাহ্ন   |   ঢাকা

বাকির খাতা থেকে রক্তের দাগ: টাঙ্গাইলে মাইকে অস্ত্র নিয়ে জড়ো হওয়ার ঘোষণায় চরম আতঙ্ক

প্রতিবেদক, টাঙ্গাইল:

একটি মুদি দোকানের বাকির টাকা চাওয়াকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া সামান্য বিরোধ এখন রূপ নিয়েছে দুই উপজেলার রক্তক্ষয়ী সংঘাতে। টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর ও গোপালপুর উপজেলার সীমান্ত এলাকায় দফায় দফায় হামলা, অগ্নিসংযোগ এবং এক বৃদ্ধের মৃত্যুর পর নতুন করে ছড়িয়ে পড়েছে যুদ্ধংদেহী মনোভাব। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, প্রকাশ্যে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় মাইক বেঁধে নিজ নিজ পক্ষকে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে নির্দিষ্ট বাজারে জড়ো হওয়ার উন্মুক্ত আহ্বান জানানো হচ্ছে। এর ফলে দুই উপজেলার সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে, যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের রক্তবন্যার আশঙ্কায় থমথম করছে পুরো এলাকা।

ঘটনার সূত্রপাত ঘটেছিল গত ২২ এপ্রিল। এক মুদি দোকানে সামান্য কিছু টাকা বাকি থাকা এবং তা চাওয়াকে কেন্দ্র করে স্থানীয় জগৎপুরা ও গোলপেচা গ্রামের দুই বাসিন্দার মধ্যে বাগ্‌বিতণ্ডা হয়। সেই তুচ্ছ ঘটনাটি মুহূর্তের মধ্যে সামাজিক মর্যাদার লড়াইয়ে রূপ নেয় এবং মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে দুই গ্রামের মানুষ লাঠিসোঁটা ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। সেদিনের সেই দফায় দফায় সংঘর্ষে স্থানীয় ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতিসহ অন্তত ২০ জন গুরুতর আহত হন। পরবর্তীতে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করলেও ভেতরে ভেতরে ক্ষোভের আগুন জ্বলছিল। প্রায় দেড় মাস পর সেই পুরোনো বিরোধের জেরে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় আবারও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে পরিস্থিতি।

গোপালপুর উপজেলার গোলপেচা গ্রামের কিছু লোক দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে ভূঞাপুর উপজেলার জগৎপুরা গ্রামের ৬৫ বছর বয়সী বৃদ্ধ কালাম তালুকদারের ওপর আকস্মিক হামলা চালায়। মৃত হাবিবুর রহমান তালুকদারের ছেলে কালাম তালুকদারকে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে দ্রুত ভূঞাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এই হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়লে সংঘাত আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। দুই পক্ষের শত শত মানুষ লাঠিসোঁটা, ঢাল-সুরকি ও রামদা নিয়ে একে অপরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। গভীর রাত পর্যন্ত চলা এই দফায় দফায় সংঘর্ষ ও হামলায় উভয় পক্ষের অন্তত ১০ জন গুরুতর আহত হন, যাদের আশঙ্কাজনক অবস্থায় টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। সংঘর্ষ চলাকালে বেশ কয়েকটি বাড়িঘরে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে, যার ফলে প্রাণভয়ে নারী ও শিশুরা এলাকা ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।

এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর শুক্রবার সকালে পরিস্থিতি আরও ঘোরালো হয়ে ওঠে। গোপালপুর উপজেলার হেমনগর ইউনিয়নের একটি গ্রামের পক্ষ থেকে সকাল থেকেই অটোরিকশায় মাইক বেঁধে প্রচারণা চালানো শুরু হয়। মাইকের উচ্চকণ্ঠের ঘোষণাটি ছিল এই রকম যে, হেমনগর ইউনিয়নবাসী যার কাছে যে ধরনের অস্ত্র আছে, তা নিয়ে যেন অনতিবিলম্বে নলিন বাজারে উপস্থিত হন। এই প্রকাশ্য উসকানিমূলক ঘোষণার পর পুরো এলাকায় রণপ্রস্তুতির আভাস পাওয়া যাচ্ছে। ভূঞাপুর ও গোপালপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোর বাসিন্দারা এখন চরম নিরাপত্তা হীনতায় ভুগছেন। স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা এই উন্মুক্ত হুমকির মুখে দ্রুত প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ এবং পাল্টা সতর্কতামূলক ও শান্তিমূলক ঘোষণা দেওয়ার জন্য প্রশাসনের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন।

হত্যাকাণ্ড এবং পরবর্তী উত্তেজনার বিষয়ে ভূঞাপুর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সেলিমুজ্জামান সেলি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, বিষয়টি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত একটি অর্থনৈতিক লেনদেন থেকে শুরু হয়েছিল। বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে এটি মীমাংসার চেষ্টা করা হলেও কিছু উগ্র মানসিকতার মানুষের কারণে আজ একটি মূল্যবান জীবন ঝরে গেল। এলাকায় শান্তি ফিরিয়ে আনতে তারা সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছেন।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এলাকায় ব্যাপক তৎপরতা শুরু করেছে। ভূঞাপুর থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. আসলাম উদ্দিন জানিয়েছেন যে, নিহত কালাম তালুকদারের সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়েছে এবং মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হচ্ছে। অন্যদিকে, উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে ভূঞাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম মোক্তার আশরাফ উদ্দিন জানান, নতুন করে যাতে কোনো সহিংসতা বা প্রাণহানি না ঘটে, সেজন্য পুরো এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও দুই গ্রামের প্রতিনিধিদের নিয়ে জরুরি বৈঠক চলছে। শুক্রবার দিনভর বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে, যাতে কোনো পক্ষই নতুন করে আইন নিজের হাতে তুলে নিতে না পারে।

Advertisement
Advertisement
Advertisement