নারায়ণগঞ্জে যুবদল নেতার সমর্থকদের হামলায় বিএনপি নেতা আহত
প্রতিবেদক, নারায়ণগঞ্জ:
নারায়ণগঞ্জে দলীয় কোন্দল ও অভ্যন্তরীণ বিরোধের জেরে এক সিনিয়র বিএনপি নেতাকে মারধর করেছেন যুবদলের এক শীর্ষ নেতার অনুসারীরা। আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিষদ ভবনের ভেতরে ও বাইরে দুই দফায় এই অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। দলটির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত একটি স্মরণসভা চলাকালীন এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এবং বিগত দিনের দলীয় আন্দোলন-সংগ্রামে কার কী ভূমিকা ছিল, তা নিয়ে কথাকাটাকাটির একপর্যায়ে এ হামলার ঘটনা ঘটে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
আহত নেতার নাম অকিল উদ্দিন ভূইয়া, যিনি জেলা বিএনপির বর্তমান আহ্বায়ক কমিটির একজন অন্যতম সদস্য। প্রত্যক্ষদর্শী ও দলীয় কর্মীদের সূত্রে জানা যায়, জেলা পরিষদ মিলনায়তনে যখন স্মরণসভার আনুষ্ঠানিকতা চলছিল, তখন বিগত দিনের রাজপথের আন্দোলন এবং সরকারবিরোধী কর্মসূচিতে কার অবদান কতটুকু—এই নিয়ে জেলা যুবদলের সদস্যসচিব মশিউর রহমান রনির সঙ্গে অকিল উদ্দিনের তীব্র বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের একপর্যায়ে জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতাদের সামনেই যুবদল নেতার অনুসারীরা অকিল উদ্দিনের ওপর চড়াও হওয়ার চেষ্টা করেন। উপস্থিত জ্যেষ্ঠ নেতারা তাৎক্ষণিকভাবে হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি সামাল দেন এবং দুই পক্ষকে শান্ত করে বিষয়টি সেখানেই মীমাংসা করে দেন।
তবে জ্যেষ্ঠ নেতাদের উপস্থিতিতে পরিস্থিতি সাময়িক শান্ত হলেও মূল উত্তেজনা স্তিমিত হয়নি। অনুষ্ঠান শেষে যুবদল নেতা মশিউর রহমান রনি এবং বিএনপি নেতা অকিল উদ্দিন ভূইয়া একসঙ্গে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে আসছিলেন। কিন্তু বিপত্তি ঘটে তারা যখন জেলা পরিষদের মূল ভবনের প্রধান ফটকটি পার হন। মূল ফটক পেরিয়ে বাইরে আসতেই যুবদল নেতার অপেক্ষমাণ অনুসারীরা অতর্কিতে অকিল উদ্দিনের ওপর হামলা চালায়। তাকে কিল-ঘুষি মেরে মাটিতে ফেলে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ ওঠে। হঠাৎ এই হামলায় উপস্থিত সাধারণ কর্মী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরে অন্যান্য নেতা-কর্মীরা এগিয়ে এসে তাকে উদ্ধার করেন।
আক্রান্ত বিএনপি নেতা অকিল উদ্দিন ভূইয়া এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, সিনিয়র নেতারা মিলনায়তনের ভেতরেই বিষয়টি সুন্দরভাবে মিটিয়ে দিয়েছিলেন এবং তিনি ও রনি একসঙ্গেই নিচে নেমে আসছিলেন। কিন্তু মূল ভবনের গেট পার হওয়ার পরপরই রনির লোকজন পূর্বপরিকল্পিতভাবে তার ওপর হামলা চালায়। এই ঘটনায় তিনি শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত ও আহত হয়েছেন। তবে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কায় এবং জ্যেষ্ঠ নেতাদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে আপাতত তিনি কোনো আইনি পদক্ষেপ বা পুলিশের দ্বারস্থ হচ্ছেন না। পুরো বিষয়টি তিনি দলের হাইকমান্ড ও জেলার শীর্ষ নেতাদের জানিয়েছেন এবং দল থেকে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস পেয়েছেন।
অন্যদিকে, এই হামলার ঘটনাটিকে অনাকাঙ্ক্ষিত ও দুঃখজনক বলে আখ্যায়িত করেছেন যুবদল নেতা মশিউর রহমান রনি। তিনি নিজের অনুসারীদের এই ঘটনায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে জানান, এতে তার কোনো ধরনের উসকানি বা পূর্ব নির্দেশনা ছিল না। দলীয় কর্মসূচির ভেতরের তর্কাতর্কির জের ধরে মাঠপর্যায়ের অতি উৎসাহী কর্মীরা তাৎক্ষণিক উত্তেজনায় এই কাণ্ড ঘটিয়েছে। দলের শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে এবং এই অনভিপ্রেত ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি ইতিমধ্যেই ওই অতি উৎসাহী কর্মীদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন বলে দাবি করেন।
নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির রাজনীতিতে এই ধরনের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও প্রকাশ্য মারধরের ঘটনা নতুন করে তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের মাঝে অস্বস্তি ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। সাধারণ নেতা-কর্মীদের মতে, যখন দলের ঐক্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তখন নেতাদের এমন প্রকাশ্য বিরোধ ও হামলা দলের ভাবমূর্তিকে সংকটে ফেলছে। এই অপ্রীতিকর বিষয়ে মন্তব্য এবং দলের পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক অধ্যাপক মামুন মাহমুদের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। দলের ভেতরে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হাইকমান্ড দ্রুত দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেবে কি না, এখন সেটাই দেখার বিষয়।