স্বপ্নের সলিল সমাধি: ডোম-ইনোর আবাসন ফাঁদে সর্বস্বান্ত হাজারো পরিবার
অনলাইন ডেস্ক:
রাজধানীর অভিজাত এলাকা ধানমন্ডির ১০/এ নম্বর সড়কের ৩৬ নম্বর প্লট। বিশ বছর আগেও এখানে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে ছিল একটি দোতলা বাড়ি, যা ঘিরে ছিল একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের হাসি-কান্না আর সাত ভাইবোনের বেড়ে ওঠার স্মৃতি। ২০০৬ সালে সেই পৈতৃক ভিটায় বহুতল আধুনিক ভবন নির্মাণের স্বপ্ন নিয়ে আবাসন প্রতিষ্ঠান ‘ডোম-ইনো বিল্ডার্স লিমিটেড’-এর সঙ্গে চুক্তি করেছিলেন অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষক শায়লা রহমান ও তাঁর ভাইবোনেরা। চুক্তি অনুযায়ী তিন বছরের মধ্যে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দুই দশক পেরিয়ে গেলেও সেই স্বপ্নের কেবল দুটি কঙ্কালসার কংক্রিটের স্ট্রাকচার দাঁড়িয়ে আছে। বিশ বছরের এই দীর্ঘ অপেক্ষায় শায়লা রহমানের পাঁচ ভাইবোন নিজেদের জমিতে স্বপ্নের বাড়ি দেখে যাওয়ার আশা বুকে নিয়েই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। এখন বেঁচে আছেন কেবল শায়লা রহমান ও তাঁর এক ছোট ভাই, যিনি গুরুতর স্ট্রোক করে অর্থের অভাবে চিকিৎসা বঞ্চিত অবস্থায় এক ভাড়া বাসায় দিন কাটাচ্ছেন। নিজেদের জমি হারিয়ে, জমানো টাকা শেষ করে আজ তাঁরা অন্যের বাড়িতে ভাড়াটিয়া। শায়লা রহমানের চোখে এখন শুধুই অন্ধকার, আর বুকভরা হাহাকার।
এই ট্র্যাজেডি কেবল শায়লা রহমানের একার নয়, রাজধানী জুড়ে ডোম-ইনোর এমন প্রায় আশিটি প্রকল্প আজ আবাসন খাতের এক অন্ধকার অধ্যায়ের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শত শত জমির মালিক নিজেদের আজীবনের সঞ্চয় আর পৈতৃক ভিটেমাটি এই কোম্পানির হাতে তুলে দিয়ে আজ পথের ভিখারি। অন্যদিকে, মধ্যবিত্তের সারাজীবনের উপার্জনের টাকা দিয়ে বুকিং দেওয়া শত শত ফ্ল্যাট ক্রেতার স্বপ্নও এখন ডোম-ইনোর প্রতারণার জালে বন্দি। তেজকুনিপাড়ার মোবারক হোসেন খানের গল্পটাও একই সুতোয় গাঁথা। ২০১২ সালে সাড়ে সাত কাঠার প্লটে সাততলা ভবন করার চুক্তি করেছিলেন বাবার ব্যাংকঋণ শোধের আশায়। চুক্তি ভাঙার পর পুরোনো দোতলা বাড়ি আর দোকান ভেঙে ডোম-ইনো জায়গাটি বুঝে নেয়। আজ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে মোবারক হোসেনের পরিবার ভাড়া বাসায় যাযাবর জীবন কাটাচ্ছে। প্রকল্প এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ফাউন্ডেশনের পিলারের মরিচা ধরা রডগুলো আকাশের দিকে চেয়ে যেন এই প্রতারণার বিচার চাইছে। জমে থাকা নোংরা পানি রূপ নিয়েছে মশার প্রজননক্ষেত্রে, আর সন্ধ্যা নামলেই সেখানে বসছে মাদকসেবীদের আসর।
একই চিত্র পল্টনের নয়াপল্টন এলাকার মঈনুল আলমের ক্ষেত্রেও। যেখানে তাঁদের চার ভাইয়ের ২১টি ফ্ল্যাট সম্বলিত চারটি বহুতল বাড়ি ছিল, সেখান থেকে প্রতি মাসে আসত বিপুল পরিমাণ ভাড়া। ২০০৭ সালে পাঁচটি উঁচু ভবন করার চুক্তিতে ডোম-ইনোকে জমি দেওয়ার পর আজ ১৯ বছর ধরে তাঁরাও ভাড়াটিয়া। কোম্পানিটি সেখানে কাজ শেষ না করেই ৪৫টি ফ্ল্যাট অন্য ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এমনকি শান্তিনগরের পীর সাহেবের গলিতে বুয়েটের শিক্ষক সুফিয়া আক্তারের প্লটটিতেও ১৯ বছরে কাজের কোনো অগ্রগতি হয়নি, বরং ফ্ল্যাট পাওয়ার তীব্র হতাশায় মারা গেছেন তাঁর চিকিৎসক সন্তান। ফ্ল্যাট ক্রেতা শরিফ হোসেন ২০১৬ সালে একটি ফ্ল্যাটের জন্য ৬০ শতাংশ টাকা পরিশোধ করেও আজ আদালতের বারান্দায় ঘুরছেন। তাঁর মতো একই প্রকল্পে আরও ১৪০ জন ক্রেতা তাঁদের কষ্টার্জিত অর্থ হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ডোম-ইনো বিল্ডার্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুস সালামের বিরুদ্ধে রাজধানী জুড়ে প্রতারণা ও জালিয়াতির অভিযোগে শতাধিক মামলা রয়েছে। ইতোমধ্যে ঢাকা মহানগর সিনিয়র দায়রা জজ আদালত একটি মামলায় তাঁকে চার বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন এবং দুটি সালিশি মামলায় প্রায় সাড় ঊনচল্লিশ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছে। বর্তমানে অন্তত ২৫টি মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা ঝুলছে। আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে আব্দুস সালাম ও তাঁর স্ত্রী, যিনি কোম্পানির চেয়ারম্যান পদে আছেন, দুজনেই এখন গা-ঢাকা দিয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, দেশের শত শত ভুক্তভোগী মানুষের কাছ থেকে নেওয়া হাজার হাজার কোটি টাকা অবৈধ উপায়ে বিদেশে পাচার করেছেন এই দম্পতি, যা নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনও তদন্ত শুরু করেছে। এদিকে, প্রতারণার ভয়াবহতা ও রিহ্যাবের কোড অব কন্ডাক্ট লঙ্ঘনের দায়ে আবাসন ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন ‘রিহ্যাব’ ইতিমধ্যে ডোম-ইনোর সদস্যপদ বাতিল করেছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ডোম-ইনো শুধু জমির মালিকদের সঙ্গেই প্রতারণা করেনি, বরং রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) কোনো রকম নকশা বা প্ল্যান অনুমোদন ছাড়াই একের পর এক বহুতল ভবন নির্মাণ করেছে। খোদ বনানীতে ডোম-ইনোর প্রধান কার্যালয় ‘ডোম ইনো হাউজ’টি ১৬ তলা করা হয়েছে, যার মধ্যে ৯ তলার পর বাকি অংশ সম্পূর্ণ অবৈধ ও রাজউকের অনুমোদনহীন। বর্তমানে এই প্রধান কার্যালয়টি প্রায় সবসময়ই তালাবদ্ধ থাকে এবং অধিকাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ছাঁটাই করা হয়েছে। মাঝেমধ্যে অফিস খুললেও অবশিষ্ট কর্মচারীরা কোনো সদুত্তর দিতে পারেন না। ভুক্তভোগীরা রাজউকের দ্বারস্থ হলে সংস্থাটি তদন্ত করে জালিয়াতির সত্যতা পেলেও অদৃশ্য কারণে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি।
আবাসন খাতের এই ভয়াবহ সংকট ও আইনের ফাঁকফোকর নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাধারণ ভুক্তভোগীরা। দেশের বিদ্যমান ‘আমমোক্তারনামা’ বা পাওয়ার অব অ্যাটর্নি আইনটি ডেভেলপারদের পক্ষে হওয়ায় জমির মালিকেরা চাইলেও সহজে চুক্তি বাতিল করতে পারছেন না। তদুপরি, বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য আরবিটেশন কোর্টে যেতে যে বিপুল অঙ্কের ফি প্রয়োজন, তা সর্বস্বান্ত হওয়া জমির মালিকদের পক্ষে জোগাড় করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এই অবস্থায় ভুক্তভোগী পরিবারগুলো সরকারের কাছে বিদ্যমান আবাসন আইনের সংস্কার, আমমোক্তারনামা বাতিলের সহজ সুযোগ এবং ডোম-ইনোতে সরকারি প্রশাসক বসিয়ে প্রকল্পগুলো দ্রুত সম্পন্ন করার জোর দাবি জানিয়েছেন। তা না হলে হাজারো পরিবারের আজীবনের লালিত স্বপ্ন ও মাথা গোঁজার শেষ আশ্রয়টুকু চিরতরে রাজধানীর এই পরিত্যক্ত ডোবা আর কংক্রিটের কঙ্কালের নিচে চাপা পড়ে থাকবে।