অপচয় থেকে সম্ভাবনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জে তৈরি হচ্ছে আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য ড্রাই ম্যাঙ্গো
মোঃআশরাফুল ইসলাম চাঁপাইনবাবগঞ্জ:
চাঁপাইনবাবগঞ্জ মানেই আম। গ্রীষ্ম এলেই জেলার বাগানগুলো ছেয়ে যায় রসা।লো আমে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পাশাপাশি বিদেশেও যায় এ জেলার বিখ্যাত আম। তবে মৌসুম শেষে অতিরিক্ত পেকে যাওয়া কিংবা বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় বিপুল পরিমাণ আম নষ্ট হয়ে যেত। যে আম একসময় কৃষকের কাছে লোকসানের কারণ হতো, সেই আমই এখন পরিণত হচ্ছে সম্ভাবনাময় খাদ্যপণ্যে। তৈরি হচ্ছে স্বাস্থ্যকর ও দীর্ঘদিন সংরক্ষণযোগ্য ড্রাই ম্যাঙ্গো, যার হাত ধরে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম পাড়ি জমাতে শুরু করেছে দেশ-বিদেশের বাজারে।
শিবগঞ্জ উপজেলার তরুণ উদ্যোক্তা ইসমাইল খান শামীম এমনই একটি উদ্যোগ নিয়ে তৈরি করেছেন ড্রাই ম্যাঙ্গো প্রক্রিয়াজাতকরণ ইউনিট। তাঁর লক্ষ্য শুধু স্থানীয় বাজারে পণ্য বিক্রি নয়, ভবিষ্যতে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ পরিচয়ে ড্রাই ম্যাঙ্গোকে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিষ্ঠিত করা।
শিবগঞ্জের একটি আমবাগানে দাঁড়ালে এখনও চোখে পড়ে গাছভর্তি আমের পরিচিত দৃশ্য। কিন্তু সেই পরিচিত আমকেই প্রযুক্তির মাধ্যমে নতুন রূপ দিয়ে বাজারজাত করার উদ্যোগ বদলে দিচ্ছে স্থানীয় কৃষি অর্থনীতির চিত্র।
ইসমাইল খান শামীম জানান, ছোটবেলা থেকেই তিনি দেখেছেন মৌসুমের শেষ দিকে অনেক ভালো আম অতিরিক্ত পেকে যাওয়ার কারণে কম দামে বিক্রি হয় কিংবা শেষ পর্যন্ত নষ্ট হয়ে যায়। তিন প্রজন্ম ধরে তাঁদের পরিবারের ব্যবসা আমকে ঘিরে। ফলে আমের এই অপচয় তাঁকে ভাবিয়ে তোলে।
২০২২ সালে থাইল্যান্ড সফরে গিয়ে শুকনো আমের বড় বাজার সম্পর্কে ধারণা পান তিনি। দেশে ফিরে শুরু করেন গবেষণা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা। পরবর্তীতে সুইজারল্যান্ডভিত্তিক উন্নয়ন সংস্থা Swisscontact-এর কারিগরি সহায়তায় নিজ বাড়িতেই গড়ে তোলেন ড্রাই ম্যাঙ্গো প্রক্রিয়াজাতকরণ ইউনিট।
দীর্ঘ সময়ের পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর বর্তমানে মৌসুমে প্রতিদিন ১০০ কেজিরও বেশি ড্রাই ম্যাঙ্গো উৎপাদন হচ্ছে। উৎপাদন প্রক্রিয়ায় প্রথমে বাগান ও স্থানীয় বাজার থেকে সংগ্রহ করা আম ভালোভাবে ধুয়ে পরিষ্কার করা হয়। এরপর খোসা ছাড়িয়ে নির্দিষ্ট আকারে কেটে নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রার ডিহাইড্রেটরে ১২ থেকে ১৮ ঘণ্টা শুকানো হয়। পরে ভ্যাকুয়াম প্যাকেজিংয়ের মাধ্যমে বাজারজাত করা হয়।
উদ্যোক্তার দাবি, কোনো কৃত্রিম সংরক্ষণকারী ব্যবহার না করেই তৈরি করা এই ড্রাই ম্যাঙ্গো সঠিকভাবে সংরক্ষণ করলে দীর্ঘ সময় ভালো থাকে। ফলে মৌসুমের কয়েক মাসের মধ্যে আম বিক্রির সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে বছরজুড়ে আমভিত্তিক পণ্য বাজারজাত করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
ড্রাই ম্যাঙ্গো উৎপাদনের সবচেয়ে বড় সুফল পাচ্ছেন স্থানীয় আমচাষিরা। মৌসুমের শেষ দিকে অতিরিক্ত পেকে যাওয়া আমের দাম যখন অনেক কমে যায়, তখন সেই আমও প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানায় বিক্রির সুযোগ পাচ্ছেন কৃষকরা।
ফলে যে আম আগে কৃষকের লোকসানের কারণ হতো, এখন সেটিই বাড়তি আয়ের উৎস হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে আমের অপচয় কমিয়ে কৃষিপণ্যের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
শুধু কৃষক নয়, কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও তৈরি হচ্ছে নতুন সম্ভাবনা। আমের মৌসুম শেষ হওয়ার পর যেসব শ্রমিকের কাজ কমে যেত, ড্রাই ম্যাঙ্গো উৎপাদনের কারণে তাঁদের জন্য তৈরি হচ্ছে বাড়তি কর্মসংস্থানের সুযোগ।
স্থানীয় উদ্যোক্তা ও সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এ ধরনের ছোট ও মাঝারি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের সংখ্যা বাড়ানো গেলে চাঁপাইনবাবগঞ্জে আমকে কেন্দ্র করে নতুন একটি শিল্পখাত গড়ে উঠতে পারে। স্থানীয় বাজার ছাড়িয়ে রপ্তানির স্বপ্ন ইসমাইল খান শামীম বলেন, তাঁদের লক্ষ্য এমন একটি পণ্য তৈরি করা, যা সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক, মানসম্মত এবং আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা পূরণে সক্ষম। ভবিষ্যতে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ পরিচয়ে এই পণ্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পৌঁছে দেওয়ার স্বপ্ন দেখছেন তিনি।
তাঁর মতে, প্রয়োজনীয় সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা পাওয়া গেলে ড্রাই ম্যাঙ্গোসহ আমভিত্তিক বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্রয়োজন নীতিগত সহায়তা
তবে সম্ভাবনা থাকলেও এই শিল্পকে বড় পরিসরে নিতে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। উদ্যোক্তাদের মতে, সহজ শর্তে ঋণ, আন্তর্জাতিক মানের প্যাকেজিং, খাদ্য নিরাপত্তা সনদ, আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ, উন্নত প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রযুক্তি এবং রপ্তানিবান্ধব নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ইতোমধ্যে বেশ কিছু তরুণ উদ্যোক্তা আমকে কেন্দ্র করে নতুন নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করছেন। এসব উদ্যোগকে শিল্পে রূপ দিতে প্রয়োজন সমন্বিত সহযোগিতা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, চাঁপাইনবাবগঞ্জের উপ-পরিচালক মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, জেলায় বেশ কিছু তরুণ উদ্যোক্তা তৈরি হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর তাঁদের সহযোগিতা করে যাচ্ছে। উদ্যোক্তারা আমকে শুধু কাঁচা ফল হিসেবে না দেখে প্রক্রিয়াজাত শিল্পে রূপ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন। এসব উদ্যোগ সফল হলে চাঁপাইনবাবগঞ্জে আমভিত্তিক শিল্পের নতুন দুয়ার খুলবে বলে আশা করা যায়।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের অর্থনীতির বড় একটি অংশ আমকে ঘিরে। কিন্তু শুধু কাঁচা আম বিক্রির ওপর নির্ভরশীলতা থাকলে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের আয় মৌসুমনির্ভর হয়ে থাকে। ড্রাই ম্যাঙ্গো, জুস, পাল্প, আচারসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত পণ্যের বিস্তার সেই বাস্তবতা বদলে দিতে পারে।
একসময় যে আম অতিরিক্ত পেকে গিয়ে মূল্য হারাত, ভবিষ্যতে সেই আমই হতে পারে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম উৎস। কৃষকের উৎপাদন, উদ্যোক্তার উদ্ভাবন এবং আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটলে চাঁপাইনবাবগঞ্জ শুধু ‘আমের রাজধানী’ হিসেবেই নয়, আমভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত শিল্পের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবেও পরিচিতি পেতে পারে।
ইসমাইল খান শামীমের ড্রাই ম্যাঙ্গো উদ্যোগ সেই সম্ভাবনারই একটি বাস্তব উদাহরণ। আজ যার যাত্রা স্থানীয় বাজারে, আগামী দিনে সেই পণ্যই হয়তো পাড়ি জমাবে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। আর তখন চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাগানে উৎপাদিত একটি আম শুধু ফল হিসেবে নয়—বাংলাদেশের একটি সম্ভাবনাময় রপ্তানি পণ্য হিসেবেও বিশ্ববাজারে পরিচিত হবে।