সিরাজগঞ্জের খামারে ‘বাহাদুর-কালা মানিকদের’ রাজত্ব: পরম মমতায় প্রস্তুত ৩৫০ কোটির কোরবানির পশু
নিজস্ব প্রতিবেদক, সিরাজগঞ্জ
ভোর হতেই সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া ও শাহজাদপুরের পল্লী জনপদে শোনা যায় খামারিদের ব্যস্ততার শব্দ। গোয়াল থেকে একে একে বের হয়ে আসছে বিশাল বপু আর চকচকে গায়ের রঙের সব গরু। একেকটির নাম যেমন রাজকীয়, অবয়বও তেমন চোখ ধাঁধানো। ‘বাহাদুর’, ‘কালা মানিক’, ‘বাদশা’ কিংবা ‘সুলতান’—এমন সব বাহারি নামের এসব গবাদি পশুকে এক নজর দেখতে প্রতিদিন খামারগুলোতে ভিড় জমাচ্ছেন দূর-দূরান্ত থেকে আসা উৎসুক ক্রেতা ও সাধারণ মানুষ। আসন্ন পবিত্র ঈদ-উল-আজহাকে কেন্দ্র করে সিরাজগঞ্জের ১৭ হাজার খামারে এখন উৎসবের আমেজ, যেখানে দিনরাত চলছে শেষ মুহূর্তের পরিচর্যা।
সিরাজগঞ্জ বরাবরই দুগ্ধ ও গবাদি পশু উৎপাদনে দেশের অন্যতম শীর্ষ জেলা। এ বছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি। জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্যমতে, এবার কোরবানির বাজারের জন্য প্রায় ৬ লাখ পশু প্রস্তুত করা হয়েছে, যার সম্ভাব্য বাজারমূল্য ধরা হচ্ছে প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা। জেলার চাহিদা মিটিয়ে প্রায় সাড়ে তিন লাখ পশু রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠানো হবে।
উল্লাপাড়ার সফল খামারি শহিদুল হকের খামারে গিয়ে দেখা যায় এক অনন্য দৃশ্য। তার প্রিয় ‘বাহাদুর’ যেন পুরো খামারের রাজা। কুচকুচে কালো রঙের সুঠাম দেহের এই গরুটিকে দেখতে প্রতিদিন ভিড় বাড়ছে। শহিদুল হক জানান, গত দুই বছর ধরে নিজের সন্তানের মতো করে বড় করেছেন এই পশুটিকে। বর্তমানে গোখাদ্যের দাম চড়া হলেও লাভের আশায় কোনো কার্পণ্য করেননি তিনি। তিনি বলেন, “ক্রেতারা অনলাইনে ছবি দেখেই মূলত আকর্ষিত হচ্ছেন। অনেকে খামারে এসে সরাসরি দেখে দরদাম করে কিনেও নিচ্ছেন। তবে মজার ব্যাপার হলো, অনেক ক্রেতা গরু কেনার পরও যায় না। শহরে জায়গার অভাব থাকায় ঈদের দু-একদিন আগ পর্যন্ত আমার কাছেই রেখে যান। আমিই তাদের আমানত হিসেবে এগুলো লালন-পালন করি।”
অন্যদিকে শাহজাদপুরের গো-খামারি নাজমুলের ব্যস্ততা যেন শেষ নেই। তিনি জানালেন তাদের প্রাকৃতিক পদ্ধতির গোপন রহস্য। কোনো প্রকার ক্ষতিকর হরমোন বা ওষুধ ছাড়াই খড়, সবুজ ঘাস, ভুষি, খৈল আর প্রাকৃতিক ভিটামিন সমৃদ্ধ খাবারের ওপর ভরসা রাখেন তারা। নাজমুল বলেন, “প্রতিদিন দুই বেলা গোসল করানো থেকে শুরু করে সময়মতো খাবার দেওয়া এবং খামার পরিষ্কার রাখা—সব মিলিয়ে আমরা খামারিরা এখন দম ফেলার সময় পাচ্ছি না। আমাদের এই হাড়ভাঙা খাটুনি সার্থক হয় যখন ক্রেতারা হাসিমুখে সুস্থ-সবল একটি পশু নিয়ে বাড়ি ফেরেন।”
সিরাজগঞ্জের এই বিশাল কর্মযজ্ঞ কেবল ব্যবসার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি এখন গ্রামীণ অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে। ছোট-বড় খামারগুলোর পাশপাশি প্রান্তিক কৃষকরাও বাড়বাড়ন্ত দামে পশু বিক্রির স্বপ্ন বুনছেন। তবে গোখাদ্যের আকাশচুম্বী দাম নিয়ে খামারিদের কপালে কিছুটা চিন্তার ভাঁজ থাকলেও, পশুর শারীরিক গঠন ও সুস্থতা নিয়ে তারা বেশ আত্মবিশ্বাসী।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. এ কে এম আনোয়ারুল হক এই কর্মব্যস্ততা নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, “জেলায় এবার চাহিদার তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি পশু প্রস্তুত রয়েছে। আমরা নিয়মিত খামারিদের পরামর্শ দিচ্ছি যেন তারা সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে পশু মোটাতাজা করেন। ৩৫০ কোটি টাকার এই বিশাল বাজার জেলার অর্থনৈতিক চিত্র বদলে দেবে বলে আমাদের বিশ্বাস।”
গোধূলি লগ্নে যখন খামারের আলোগুলো জ্বলে ওঠে, তখন ‘কালা মানিক’ বা ‘বাদশাদের’ গায়ে পরম মমতায় হাত বুলিয়ে দেন খামারিরা। দীর্ঘদিনের লালন-পালন শেষে বিচ্ছেদের বেদনা থাকলেও, ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত কোরবানির হাটে সিরাজগঞ্জের এই পশুগুলোই যে সেরা আকর্ষণ হতে যাচ্ছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।