ভারতের সামান্য ফি নিয়ে আপত্তি, চীনা বিদ্যুতে বেশি খরচ
সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে ছবি-সংগৃহীতঅনলাইন ডেস্ক:
ভারতের বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিটে মাত্র ০.০১ রুপি বাড়তি চার্জের প্রস্তাবে আপত্তি জানিয়েছিল বাংলাদেশ। সেই চার্জ পরে অর্ধেক করে ০.০০৫ রুপি করা হয়েছে। এর কয়েক দিন পরই ঢাকার আমিনবাজারে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পে চীনা একটি কোম্পানিকে প্রতি ইউনিটে ২৫ টাকা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ সরকার।
ভারতের কাছ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ গড়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ কিনেছে প্রায় ১১ টাকা দরে। সেই হিসাবে আমিনবাজার প্রকল্পের প্রস্তাবিত ২৫ টাকা দর ভারত থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের গড় দামের চেয়ে প্রায় ১২৭ শতাংশ বেশি।
তবে দুটি দামের সরাসরি তুলনা পুরো বিষয়টি তুলে ধরে না। ভারতের ০.০০৫ রুপির চার্জ বিদ্যুতের দাম নয়; এটি আন্তদেশীয় বিদ্যুৎ লেনদেনে সময়সূচি নির্ধারণ, মিটারিং, বিদ্যুৎ হিসাব ও গ্রিড পরিচালনার মতো সেবার জন্য নেওয়া অতিরিক্ত ফি। আর ২৫ টাকা হলো বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী একটি প্রকল্পের প্রস্তাবিত বিদ্যুৎ মূল্য।
কেন ২৫ টাকা দরে বিদ্যুৎ
আমিনবাজারের প্রকল্পটি মূলত বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি ঢাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য নেওয়া হচ্ছে। ঢাকার আমিনবাজার ল্যান্ডফিলটি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ব্যবস্থাপনায় রয়েছে।
‘নিউ এজ’-এর ২৭ আগস্টের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চীনা একটি কোম্পানি সেখানে বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে বিদ্যুৎ ও জৈব সার উৎপাদন করবে। এর বিনিময়ে প্রতিষ্ঠানটি ল্যান্ডফিল ব্যবহারের জন্য ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনকে মাসিক ভাড়াও দেবে।
প্রকল্পটির উৎপাদনক্ষমতা হবে ৪২ মেগাওয়াট। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানিয়েছেন, ১৮ মাসের মধ্যে উৎপাদন শুরু করার লক্ষ্য রয়েছে। ২০২৮ সালের আগস্ট বা সেপ্টেম্বরে এই বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতে পারে।
প্রকল্পে সরকারকে সরাসরি বিনিয়োগ করতে হবে না বলেও জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।বিদ্যুতের প্রস্তাবিত দাম বেশি হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেছেন, প্রকল্পটির পরিবেশগত সুবিধাও বিবেচনায় নিতে হবে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, কার্বন ক্রেডিট এবং পরিবেশ সুরক্ষার মাধ্যমে প্রকল্পটির বাড়তি ব্যয় পুষিয়ে নেওয়ার যুক্তি দেখানো হয়েছে।
আমদানি করা বিদ্যুতের দামও বেড়েছে
বাংলাদেশে আমদানি করা বিদ্যুতের গড় দাম গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ‘দ্য ডেইলি স্টার’-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রতি ইউনিট আমদানি করা বিদ্যুতের গড় দাম ছিল ৫ টাকা ৮২ পয়সা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১১ টাকা ৭২ পয়সায়।
এর তুলনায় আমিনবাজার প্রকল্পের ২৫ টাকা দর দ্বিগুণেরও বেশি।
তবে প্রকল্পটির আকার ভারতের কাছ থেকে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ আমদানির তুলনায় খুবই ছোট। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভারত থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের পেছনে বাংলাদেশ প্রায় ১৯ হাজার ২২৫ কোটি টাকা খরচ করেছে। ওই বছর দেশের মোট বিদ্যুৎ কেনার ব্যয় ছিল প্রায় ১ লাখ ২১ হাজার ৪২০ কোটি টাকা। মোট বিদ্যুৎ কেনার ব্যয়ের প্রায় ১৫ দশমিক ৮ শতাংশ এসেছে ভারত থেকে আমদানি করা বিদ্যুৎ বাবদ।
অন্যদিকে আমিনবাজারের প্রকল্প থেকে আসবে মাত্র ৪২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। তাই এটিকে ভারতের বিদ্যুৎ সরবরাহের বিকল্প হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
বিদ্যুৎ সংকটের মধ্যেই নতুন প্রকল্প
আমিনবাজার প্রকল্পের প্রস্তাবিত দাম নিয়ে আলোচনা হচ্ছে এমন এক সময়ে, যখন বাংলাদেশ তীব্র বিদ্যুৎ সংকটের মুখে রয়েছে। গ্যাস ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘ সময় লোডশেডিংয়ের কারণে জনভোগান্তিও বেড়েছে।
বিদ্যুৎ খাতে প্রতিদিন এক বিলিয়ন ঘনফুটের বেশি গ্যাসের প্রয়োজন হলেও সরবরাহ নেমে এসেছে প্রায় ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুটে। এতে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে উৎপাদন কমেছে এবং বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখতে হয়েছে।
কোথাও কোথাও মানুষকে দিনে ৯ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎবিহীন থাকতে হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভও হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে সরকার একদিকে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের উদ্যোগ নিয়েছে, অন্যদিকে আমদানি করা বিদ্যুতের সরবরাহও কমেছে।
ভারত এখনো বড় সরবরাহকারী
চীনা কোম্পানির বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প সামনে এলেও বাংলাদেশে আমদানি করা বিদ্যুতের অন্যতম বড় উৎস এখনো ভারত। বিভিন্ন চুক্তির আওতায় ভারত থেকে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৬৫৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির ব্যবস্থা রয়েছে বাংলাদেশের।
এর বিপরীতে আমিনবাজার প্রকল্পের উৎপাদনক্ষমতা মাত্র ৪২ মেগাওয়াট। ফলে প্রকল্পটি ভারতের বিদ্যুৎ সরবরাহের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার মতো অবস্থানে নেই।এর মূল লক্ষ্য ঢাকার বিপুল পরিমাণ বর্জ্যকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ ও জৈব সার উৎপাদন করা।
বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে চীনের ভূমিকা বাড়তে পারে
আমিনবাজারের প্রকল্পটি বাংলাদেশে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে চীনের আরও বড় ভূমিকার পথ খুলে দিতে পারে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ল্যান্ডফিলে জমে থাকা বর্জ্য থেকেও বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ জন্য চীনের কোম্পানি পাওয়ারচায়নার সঙ্গে যোগাযোগের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বর্জ্যকে বিদ্যুতে রূপান্তরের ক্ষেত্রে চীনা কোম্পানিগুলোর অংশগ্রহণ আরও বাড়তে পারে।
তবে আপাতত আমিনবাজারের ৪২ মেগাওয়াটের প্রকল্পটি দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের তুলনায় ছোটই থাকবে।
একদিকে বিদ্যুৎ সংকট ও লোডশেডিং নিয়ে জনভোগান্তি বাড়ছে, অন্যদিকে ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানির ক্ষেত্রে সামান্য অতিরিক্ত চার্জ নিয়েও আপত্তি জানিয়েছে ঢাকা। এর মধ্যেই বর্জ্য থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের জন্য চীনা কোম্পানিকে প্রতি ইউনিটে ২৫ টাকা দেওয়ার প্রস্তাব নতুন করে বিদ্যুৎ খাতের ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
তবে প্রকল্পটির পক্ষে সরকারের যুক্তি হলো, এখানে শুধু বিদ্যুৎ কেনা হচ্ছে না; একই সঙ্গে ঢাকার বড় একটি বর্জ্য সমস্যার সমাধান, পরিবেশ সুরক্ষা এবং বর্জ্য থেকে জৈব সার উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।