বিদেশি যোদ্ধা ও সহায়তায় সুদানের যুদ্ধ তীব্র
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
বিদেশি যোদ্ধা নিয়োগ এবং বিভিন্ন দেশের সামরিক সহায়তায় সুদানের গৃহযুদ্ধ আরও দীর্ঘ ও ভয়াবহ হচ্ছে বলে জাতিসংঘ-সমর্থিত এক তদন্তে উঠে এসেছে। অস্ত্র, সামরিক প্রযুক্তি ও যোদ্ধা সরবরাহের মাধ্যমে যুদ্ধরত পক্ষগুলোর সামরিক সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে, যার সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে দেশটির বেসামরিক জনগণকে।
জাতিসংঘের সুদানের জন্য গঠিত স্বাধীন আন্তর্জাতিক ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশন বৃহস্পতিবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলেছে, একাধিক দেশে সক্রিয় আন্তঃদেশীয় নেটওয়ার্ক আধাসামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ)-এর পক্ষে বিদেশি যোদ্ধাদের নিয়োগ, প্রশিক্ষণ ও মোতায়েন করছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সুদানের সশস্ত্র বাহিনী (এসএএফ) এমন ড্রোন ব্যবহার করেছে-এমনটা বিশ্বাস করার ‘যৌক্তিক ভিত্তি’ রয়েছে, যেগুলো বিদেশ থেকে সরবরাহ করা হয়েছিল এবং যেসব অভিযানে বেসামরিক মানুষ ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে এসএএফ ও আরএসএফের মধ্যে চলা যুদ্ধে কয়েক দশক হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন লাখ লাখ মানুষ।
তদন্ত মিশনের সদস্য মোনা রিশমাওয়ি বলেন, বিদেশি সহায়তা জামজাম শরণার্থী শিবিরে আরএসএফের অভিযান এবং পরে এল-ফাশের দখলে নেওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে। সেখানে গুরুতর মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অপরাধের ঘটনা নথিভুক্ত করেছে জাতিসংঘের মিশন। এর কিছু কর্মকাণ্ডে গণহত্যার বৈশিষ্ট্যও দেখা গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদেশি সহায়তায় আরএসএফ ও এসএএফ, উভয় পক্ষের ড্রোন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে তারা যুদ্ধের সম্মুখসীমা থেকে অনেক দূরের এলাকাতেও হামলা চালাতে পারছে।
নথিভুক্ত হামলাগুলোর মধ্যে দক্ষিণ কর্দোফানের কালোগিতে আরএসএফের ড্রোন হামলায় ১১৪ জন নিহত হওয়ার ঘটনা রয়েছে। পূর্ব দারফুরের আদ-দেইনে সেনাবাহিনীর হামলায় অন্তত ৭০ জন নিহত হন এবং একটি বড় হাসপাতাল ধ্বংস হয়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, চলতি বছরের জুলাই ও আগস্টে উত্তর কর্দোফানের এল-ওবেইদে আরএসএফের বারবার ড্রোন হামলা ‘মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন’ হতে পারে এবং তা যুদ্ধাপরাধের পর্যায়েও পড়তে পারে।
তদন্ত মিশনের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ চান্দে ওথমান বলেন, বিদেশি সহায়তার পরিণতি সবচেয়ে তীব্রভাবে ভোগ করতে হচ্ছে বেসামরিক মানুষকে।
একাধিক দেশে বিস্তৃত নেটওয়ার্ক
তদন্তে ২ হাজার পর্যন্ত সাবেক কলম্বিয়ান সামরিক ঠিকাদারকে সুদানে মোতায়েনের তথ্য পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাঁরা দারফুর ও কর্দোফানে আরএসএফ ইউনিটের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধ ড্রোন, কামান ও উন্নত অস্ত্র পরিচালনা করেছেন।
কলম্বিয়া সরকার তদন্তকারীদের জানিয়েছে, তারা ভাড়াটে যোদ্ধাবৃত্তির বিরোধী এবং বিদেশি সংঘাতে তাদের নাগরিকদের অংশগ্রহণ বন্ধে পদক্ষেপ নিচ্ছে।
সাক্ষীদের বরাতে প্রতিবেদনে দক্ষিণ সুদান, চাদ ও ইথিওপিয়ার যোদ্ধাদের উপস্থিতির কথাও বলা হয়েছে। তাঁদের ভাষা, উচ্চারণ এবং কিছু ক্ষেত্রে পোশাক দেখে শনাক্ত করা হয়েছে। এসব যোদ্ধার মধ্যে নারীরাও ছিলেন এবং তাঁরা মূলত প্রযুক্তিগত নয়, সম্মুখসারির ভূমিকায় কাজ করছিলেন।
কলম্বিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন দেশে সক্রিয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, মধ্যস্থতাকারী ও নিয়োগকারীরা চাদ, লিবিয়া ও সোমালিয়াকে ট্রানজিট এলাকা হিসেবে ব্যবহার করে আরএসএফের কাছে জনবল, প্রশিক্ষণ, অস্ত্র ও রসদ পৌঁছে দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত আরএসএফকে সামরিক, রসদ, আর্থিক বা রাজনৈতিক সহায়তা দেওয়ার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। চাদ জানিয়েছে, তারা যুদ্ধে নিরপেক্ষ রয়েছে। সোমালিয়া সরকারও অভিযোগগুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে।
জাতিসংঘের তদন্ত মিশন বিভিন্ন দেশকে অবৈধ অস্ত্র ও সরবরাহ নেটওয়ার্ক বন্ধ এবং জাতিসংঘের অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার আহ্বান জানিয়েছে।
জাতিসংঘের হিসাবে, ২০২৩ সাল থেকে সুদানের গৃহযুদ্ধে ১ কোটি ২০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। ধ্বংস হয়েছে বেসামরিক অবকাঠামো, ভেঙে পড়েছে মৌলিক সেবা এবং তৈরি হয়েছে বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকট। অন্তত ৩০ লাখ সুদানি প্রতিবেশী দেশ মিসর, চাদ ও দক্ষিণ সুদানসহ বিভিন্ন দেশে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিয়েছেন।
সুদানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের তথ্য ও প্রমাণ সংগ্রহের জন্য জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিল ২০২৩ সালের অক্টোবরে এই ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশন গঠন করে। স্বাধীন এই তদন্ত দলটি জাতিসংঘের পক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে বক্তব্য দেয় না।
সূত্র: আলজাজিরা