রাফালোকে ইহুদিবিদ্বেষী বলার প্রতিবাদে ১৮০ ইহুদি
ছবি-সংগৃহীতআন্তর্জাতিক ডেস্ক:
হলিউড অভিনেতা মার্ক রাফালোকে ইহুদিবিদ্বেষী বলার অভিযোগের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন ১৮০ জনের বেশি বিশিষ্ট ইহুদি ব্যক্তি। তাঁদের অধিকাংশই বিনোদন জগতের সঙ্গে যুক্ত। প্যারামাউন্ট স্কাইড্যান্স ও ওয়ার্নার ব্রাদার্স ডিসকভারির প্রস্তাবিত একীভূতকরণের বিরোধিতা করায় রাফালোকে যে অভিযোগের মুখে পড়তে হয়েছে, তার প্রতিবাদেই তাঁরা অভিনেতার পাশে দাঁড়িয়েছেন।
‘দ্য হাল্ক’ ও ‘অ্যাভেঞ্জার্স’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য পরিচিত রাফালো প্রস্তাবিত ১১১ বিলিয়ন ডলারের চুক্তিটির সমালোচনা করে এর সঙ্গে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ওরাকলের সহপ্রতিষ্ঠাতা ল্যারি এলিসনের পরিবারের মালিকানাধীন প্যারামাউন্ট এবং ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের প্রসঙ্গ টানেন। গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে তিনি ‘গণহত্যা’ হিসেবে উল্লেখ করেন এবং ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর সঙ্গে ওরাকলের কাজের সমালোচনা করেন।
এর পরই প্যারামাউন্ট রাফালোর বক্তব্যকে ‘ইহুদিবিদ্বেষী ধারণার’ প্রকাশ বলে অভিযোগ করে। প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, একটি ব্যবসায়িক লেনদেনের প্রসঙ্গে ‘গণহত্যা’ ও ‘বর্ণবাদী বৈষম্য’ বা ‘অ্যাপার্টহাইড’-এর মতো শব্দ ব্যবহার করা সীমা ছাড়িয়ে গেছে।
রাফালো এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেন, প্যারামাউন্টের বক্তব্য ‘ভয়াবহ এবং মৌলিকভাবে অসৎ’। তাঁর দাবি, ইসরায়েল সরকারের নীতি, সামরিক প্রযুক্তির চুক্তি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী কর্মকর্তাদের সমালোচনা করা ইহুদি জনগোষ্ঠীর সমালোচনা নয়।
যে মন্তব্য ঘিরে বিতর্ক
গত ২১ আগস্ট রাফালো নিজের ইনস্টাগ্রাম স্টোরিতে ওরাকলের নির্বাহী ভাইস চেয়ারম্যান সাফরা ক্যাটজের একটি পুরোনো ভিডিও শেয়ার করেন। ভিডিওতে ক্যাটজ ২০২৩ সালের অক্টোবরে ইসরায়েলের ওপর হামলার পর দেশটির প্রতি ওরাকলের সহায়তার কথা তুলে ধরেছিলেন।
ভিডিওতে ক্যাটজ ওরাকলের প্রযুক্তি ইসরায়েলের জন্য ব্যবহারের কথা বলেছিলেন। রাফালো সেই বক্তব্যের সমালোচনা করে অভিযোগ করেন, গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের সময় ওরাকল ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীকে প্রযুক্তিগত সহায়তা দিচ্ছে।
রাফালো আরও প্রশ্ন তোলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কেন প্রস্তাবিত এই একীভূতকরণকে এগিয়ে নিয়েছেন। তাঁর মতে, এ ধরনের একীভূতকরণ সাধারণত কর্মী, ভোক্তা এবং সংশ্লিষ্ট শিল্পের জন্য ক্ষতিকর।
রাফালোর বক্তব্যের পর ইসরায়েলপন্থী সাইমন উইজেনথাল সেন্টারের প্রধান নির্বাহী জিম বার্ক তাঁকে ইহুদিদের ‘অবমাননা’ করার অভিযোগে আক্রমণ করেন। অ্যান্টি-ডিফেমেশন লীগের প্রধান জোনাথন গ্রিনব্ল্যাটও রাফালোর বক্তব্যকে তীব্র ভাষায় সমালোচনা করেন।
পরে রাফালো বলেন, তাঁর অবস্থান তাঁর নিজস্ব রাজনৈতিক বিশ্বাস থেকে এসেছে এবং এটিকে কোনোভাবেই ইহুদি জনগোষ্ঠীর প্রতি বিদ্বেষ হিসেবে দেখা উচিত নয়।
রাফালোর পাশে হলিউডের অনেকে
প্যারামাউন্ট ও ওয়ার্নার ব্রাদার্স ডিসকভারির একীভূতকরণের বিরুদ্ধে রাফালো একা নন। গত এপ্রিল মাসে চলচ্চিত্র শিল্পের ১ হাজার ৪০০ জনের বেশি ব্যক্তি প্রস্তাবিত চুক্তির বিরোধিতা করে একটি চিঠিতে স্বাক্ষর করেন। তাঁদের মধ্যে বেন স্টিলার ও এমা থম্পসনের মতো অভিনেতা-অভিনেত্রী এবং চলচ্চিত্র নির্মাতারাও ছিলেন।
চিঠিতে বলা হয়, এই চুক্তি এমনিতেই কেন্দ্রীভূত গণমাধ্যম খাতে আরও ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ঘটাবে এবং প্রতিযোগিতা কমিয়ে দেবে।
ফিলিস্তিনের ইতিহাস নিয়ে কাজ করা ইহুদি ইতিহাসবিদ জ্যাকারি ফস্টার রাফালোর বিরুদ্ধে ইহুদিবিদ্বেষের অভিযোগকে ‘অযৌক্তিক দ্বৈত মানদণ্ড’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, ইসরায়েলের সমালোচনা করলেই কাউকে ইহুদিবিদ্বেষী বলা হচ্ছে, অথচ অন্য কোনো দেশের সমালোচনাকে সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিদ্বেষ হিসেবে দেখা হয় না।
ফস্টার বলেন, ল্যারি এলিসনের পরিবার যেভাবে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বড় গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে মালিকানা বাড়াচ্ছে এবং ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে, সেই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা গুরুত্বপূর্ণ।
এলিসন নিজেও ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর বন্ধুদের সংগঠন ‘ফ্রেন্ডস অব দ্য ইসরায়েলি আর্মি’-এর বড় অর্থদাতা। ২০১৭ সালেই তিনি সংগঠনটিকে ১ কোটি ৬৬ লাখ ডলার দিয়েছিলেন।
ইসরায়েলের সমালোচকদের বিরুদ্ধে অভিযোগের ইতিহাস
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইসরায়েলের সমালোচকদের ইহুদিবিদ্বেষী হিসেবে অভিযুক্ত করার ঘটনা নতুন নয়। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে ফিলিস্তিনপন্থী কণ্ঠ ও ইসরায়েলবিরোধী সমালোচনা দমনে এ ধরনের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে তাঁদের দাবি।
আমেরিকান-অ্যারাব অ্যান্টি-ডিসক্রিমিনেশন কমিটির আইনবিষয়ক পরিচালক জেনিন ইউনেস বলেন, ইসরায়েলের সমালোচনা বা জায়নবাদবিরোধী বক্তব্যকে ইহুদিবিদ্বেষের সঙ্গে এক করে দেখানোর মাধ্যমে নাগরিক অধিকার আইনের অপব্যবহার করা হচ্ছে।
তিনি যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষাবিদ নরম্যান ফিংকেলস্টেইন ও স্টিভেন সালাইতার উদাহরণ দেন। ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনিদের প্রতি ইসরায়েলের আচরণের সমালোচনার কারণে তাঁরা পেশাগতভাবে গুরুতর পরিণতির মুখে পড়েছিলেন বলে ইউনেস দাবি করেন।
অস্কারজয়ী অভিনেত্রী সুসান সারান্ডন ও ‘স্ক্রিম’ তারকা মেলিসা বারেরারাও গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের সমালোচনার পর পেশাগতভাবে চাপের মুখে পড়েছেন। শিশুদের শিক্ষা নিয়ে কাজ করা ইউটিউবার ‘মিস র্যাচেল’ও গাজায় শিশুদের হত্যা ও অনাহারের বিষয়ে কথা বলায় সমালোচনার মুখে পড়েন।
ফিলিস্তিন-আমেরিকান রাজনৈতিক বিশ্লেষক ইউসুফ মুনাইয়ার বলেন, ইসরায়েল ও তার সমর্থকেরা নিজেদের নীতির পক্ষে যুক্তি দেওয়ার বদলে সমালোচকদের আক্রমণ করাকে বেশি কার্যকর মনে করছেন। তাঁর মতে, সমালোচকদের ইহুদিবিদ্বেষী আখ্যা দেওয়া পুরোনো কৌশলগুলোর একটি।
ফিলিস্তিনপন্থী আন্দোলনে প্রভাব
ইউনেসের মতে, ইহুদিবিদ্বেষের অভিযোগ ফিলিস্তিনপন্থী আন্দোলনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তাঁর দাবি, যুক্তরাষ্ট্রে ক্যাম্পাসভিত্তিক প্রতিবাদ আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে, কারণ প্রতিবাদকারীদের বিরুদ্ধে নেওয়া কঠোর পদক্ষেপ অন্যদেরও ভয় পাইয়ে দিয়েছে।
তিনি কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী মাহমুদ খলিল ও টাফটস বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রুমেইসা ওজতুর্কের উদাহরণ দেন। গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের সমালোচনার সঙ্গে তাঁদের আটক হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে ইউনেস বলেন, এ ধরনের ঘটনায় অন্যরাও রাজনৈতিক অবস্থান নেওয়ার ক্ষেত্রে ঝুঁকি নিতে ভয় পান।
ইসরায়েল নিয়ে জনমত বদলাচ্ছে
রাফালোর বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রতিবাদ যখন জোরালো হচ্ছে, একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে ইসরায়েল নিয়ে জনমতও বদলাচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞরা বলছেন।
গ্যালাপের ফেব্রুয়ারির এক জরিপে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের ৪১ শতাংশ মানুষ ফিলিস্তিনিদের প্রতি বেশি সহানুভূতিশীল, যেখানে ইসরায়েলের প্রতি বেশি সহানুভূতিশীল ৩৬ শতাংশ। ২০২৩ সালের অক্টোবরের আগে চিত্রটি ছিল ভিন্ন-তখন ৫৪ শতাংশ মানুষ ইসরায়েলের প্রতি এবং ৩১ শতাংশ ফিলিস্তিনিদের প্রতি বেশি সহানুভূতি জানিয়েছিলেন।
ফস্টারের মতে, গাজার পরিস্থিতি সম্পর্কে মানুষ সরাসরি ভিডিও ও ভয়াবহ দৃশ্য দেখেছে। এর ফলে ইসরায়েল সম্পর্কে তাঁদের ধারণা বদলেছে।
এদিকে রাফালোর পক্ষে হলিউডের জেন ফন্ডা, জন কুসাক ও ‘হ্যাকস’ তারকা হান্না আইনবাইন্ডারসহ অনেকে কথা বলেছেন। বুধবার তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন ১৮০ জনের বেশি বিশিষ্ট ইহুদি ব্যক্তি।
রাফালোর সমর্থনে দেওয়া তাঁদের চিঠিতে বলা হয়, ইহুদিবিদ্বেষের অভিযোগকে যারা ফিলিস্তিনিদের ওপর আক্রমণ এবং নিজেদের দেশের নাগরিক অধিকার সংকটের মধ্যে সম্পর্ক তুলে ধরার বিরুদ্ধে ব্যবহার করছেন, তাঁদের এভাবে অভিযোগ তোলা বন্ধ করা উচিত।
সূত্র: আলজাজিরা