ব্রাজিলের ফুটবলে বড় ধাক্কা, খেলোয়াড় বিক্রির আয় কমেছে প্রায় ৭০ শতাংশ
শাহনুর রুমেন | সাও পাওলো (ব্রাজিল)
ব্রাজিলের ফুটবলে খেলোয়াড় বিক্রির বাজারে বড় ধাক্কা লেগেছে। ২০২৬ সালের মাঝামাঝি দলবদল উইন্ডোতে দেশটির শীর্ষ বিভাগের ২০টি ক্লাব খেলোয়াড় বিক্রি ও ধারে দেওয়া থেকে আয় করেছে মাত্র ১২০.৫ মিলিয়ন ইউরো, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় নয়, প্রায় ৭১৯.৪ মিলিয়ন ব্রাজিলিয়ান রিয়াল। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এই আয় কমেছে প্রায় ৭০ শতাংশ।
২০২৫ সালের একই দলবদল উইন্ডোতে ব্রাজিলের Série A-এর ক্লাবগুলো খেলোয়াড়দের অর্থনৈতিক স্বত্ব বিক্রি ও ঋণচুক্তি থেকে আয় করেছিল ৩৯৯.৫ মিলিয়ন ইউরো, যা ছিল প্রায় ২.৪ বিলিয়ন রিয়াল। এক বছরের ব্যবধানে আয়ের এই বড় পতন দেশটির ক্লাবগুলোর জন্য নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বড় ট্রান্সফার কার্যত নেই
ব্রাজিলের ক্লাবগুলো দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপের বড় দলগুলোর কাছে তরুণ প্রতিভা বিক্রি করে বিপুল অর্থ আয় করে আসছে। কিন্তু এবার সেই বাজারে বড় অঙ্কের লেনদেন খুব কম হয়েছে।
২০২৬ সালের এই উইন্ডোতে ব্রাজিল থেকে একমাত্র বড় অঙ্কের আন্তর্জাতিক ট্রান্সফার হিসেবে আলোচনায় এসেছে পালমেইরাসের অ্যালানকে ম্যানচেস্টার সিটিতে পাঠানোর চুক্তি। চুক্তিটির মূল্য সর্বোচ্চ প্রায় ৪০ মিলিয়ন ইউরো পর্যন্ত যেতে পারে।
এ ছাড়া গ্রেমিওর ভিয়েরি ফিওরেন্তিনায়, অ্যাথলেতিকো-PR-এর ব্রুনিনহো শাখতার দোনেৎস্কে এবং ফ্লুমিনেন্সের ফাকুন্দো বেরনাল রিয়াল বেতিসে যাওয়ার মতো কয়েকটি উল্লেখযোগ্য দলবদল হয়েছে। তবে গত কয়েক বছরের তুলনায় বড় অঙ্কের লেনদেনের সংখ্যা ছিল উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
২০২২ সালের পর সবচেয়ে দুর্বল বাজার
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২২ সালের পর মাঝামাঝি দলবদল উইন্ডোতে ব্রাজিলের ক্লাবগুলোর জন্য এটি সবচেয়ে দুর্বল সময়। গত তিন বছর ধরে প্রতিবারই এই সময়ে ব্রাজিলের Série A ক্লাবগুলো খেলোয়াড় বিক্রি ও ধারে দেওয়া থেকে অন্তত ১৭০ মিলিয়ন ইউরো আয় করেছিল। এবার সেই অঙ্কও ছুঁতে পারেনি।
শুধু বিদেশি ক্লাবের কাছে বিক্রিই নয়, এবারের ১২০.৫ মিলিয়ন ইউরোর একটি অংশ ব্রাজিলের অভ্যন্তরীণ ক্লাবগুলোর মধ্যকার লেনদেন থেকেও এসেছে। অর্থাৎ পুরো অর্থ ব্রাজিলের ফুটবল অর্থনীতিতে বিদেশি বিনিয়োগ হিসেবে প্রবেশ করেনি।
ইউরোপের বাজারে পরিবর্তনের প্রভাব
ব্রাজিলিয়ান খেলোয়াড়দের সবচেয়ে বড় ক্রেতা ইউরোপের ক্লাবগুলো। কিন্তু এবারের ইউরোপীয় দলবদল বাজারে ব্রাজিল থেকে নতুন খেলোয়াড় কেনার ক্ষেত্রে আগের মতো আগ্রহ দেখা যায়নি।
এর সঙ্গে আরও একটি বিষয় প্রভাব ফেলেছে। ব্রাজিলের অনেক খেলোয়াড় ইতোমধ্যে নিজ নিজ ক্লাবের হয়ে নির্দিষ্ট সংখ্যক ম্যাচ খেলে ফেলায় ইউরোপীয় ক্লাবের হয়ে একই মৌসুমে খেলতে যাওয়ার ক্ষেত্রে নিয়মগত সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। ফলে বেশ কিছু সম্ভাব্য দলবদলও বাস্তবে রূপ নেয়নি।
বৈশ্বিক বাজারে অবশ্য রেকর্ড
মজার বিষয় হলো, ব্রাজিলিয়ান ক্লাবগুলোর আয় কমলেও বিশ্ব ফুটবলের দলবদল বাজারে এবার রেকর্ড হয়েছে। ২০২৬/২৭ মৌসুমের ইউরোপীয় শীর্ষ লিগগুলোর দলবদলে মোট লেনদেন হয়েছে প্রায় ১০.৪ বিলিয়ন ইউরো, যা ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ১০ বিলিয়ন ইউরোর সীমা অতিক্রম করেছে!
অর্থাৎ বিশ্ব ফুটবলে অর্থের প্রবাহ বাড়লেও সেই প্রবাহ থেকে ব্রাজিলের ক্লাবগুলো এবার আগের মতো বড় অংশ নিতে পারেনি।
পুরো ব্রাজিলিয়ান ফুটবল অর্থনীতি কি সংকটে?
তবে খেলোয়াড় বিক্রির এই পতনকে ব্রাজিলের পুরো ফুটবল অর্থনীতির সংকট হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
EY-এর হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ব্রাজিলের Série A-এর ২০টি ক্লাবের সম্মিলিত আয় দাঁড়িয়েছিল ১৪.৯ বিলিয়ন রিয়াল, যা আগের বছরের তুলনায় ৩৩ শতাংশ বেশি। একই সঙ্গে ক্লাবগুলোর নিট ঋণের পরিমাণও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪.৩ বিলিয়ন রিয়ালে।
তবে খেলোয়াড় বিক্রি ব্রাজিলিয়ান ক্লাবগুলোর অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হওয়ায় এবারের বাজারের পতন অবশ্যই সতর্কবার্তা। বিশেষ করে তরুণ প্রতিভা তৈরি করে ইউরোপে বিক্রি করার যে মডেল বহু বছর ধরে ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস, সেই মডেল এখন নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে।