ইসরায়েলের বিষয়ে সিরিয়ার সংযম কি ঝুঁকি বাড়াচ্ছে
ছবি-সংগৃহীতআন্তর্জাতিক ডেস্ক:
ইসরায়েলের সঙ্গে উত্তেজনা এড়াতে সিরিয়া যে সংযত নীতি অনুসরণ করছে, তার বড় ঝুঁকিও আছে। এই নীতি ইসরায়েলকে সিরিয়ার সার্বভৌমত্বে আরও হস্তক্ষেপের সুযোগ করে দিতে পারে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলি হামলার জবাব না দিলে সিরিয়ার জনগণ এবং বৃহত্তর আরব বিশ্বের আস্থাও হারাতে পারে দামেস্ক।
গত সপ্তাহেই আবার সিরিয়ার ভূখণ্ডে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। পশ্চিম দামেস্কের গ্রামাঞ্চলে বেইত জিনের কাছে একটি পাহাড়ি এলাকায় গোলাবর্ষণ করে ইসরায়েলি বাহিনী। একই সময়ে কুনেইত্রা প্রদেশের একটি গ্রামে অভিযান চালায় তারা।
এর কয়েক দিন আগেই উত্তর সিরিয়ার আবু আল-দুহুর সামরিক ঘাঁটিতে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান হামলা চালায়। এতে ঘাঁটির ব্যাপক ক্ষতি হয়। ইসরায়েলের দাবি, তুরস্ক সেখানে সম্ভাব্য সামরিক মোতায়েন করতে পারে-এমন আশঙ্কা থেকেই হামলা চালানো হয়েছে। তবে দামেস্ক ও আঙ্কারা উভয়েই ইসরায়েলের এই দাবি নাকচ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রও আবু আল-দুহুরে হামলার সমালোচনা করেছে।
কূটনীতির মাধ্যমে উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করলেও ইসরায়েলি হামলা থামাতে পারেনি সিরিয়া। প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার সরকার একদিকে সংঘাত এড়িয়ে চলছে, অন্যদিকে বারবার বলছে, ইসরায়েলকে সিরিয়ার দখল করা ভূখণ্ড থেকে সরে যেতে হবে। পাশাপাশি সিরিয়াকে নিজের সেনাবাহিনী পুনর্গঠন এবং পছন্দের অংশীদারদের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা করার স্বাধীনতাও দিতে হবে।
এই অবস্থান শুধু সিরিয়ার সামরিক দুর্বলতাই প্রকাশ করে না। এর মধ্য দিয়ে বোঝা যায়, নতুন সিরীয় নেতৃত্ব মনে করছে-প্রথমে রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা পুনর্গঠন করতে হবে, তারপর সার্বভৌমত্ব কার্যকরভাবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে।
কিন্তু এই কৌশলের বিপদও কম নয়। সিরিয়ার সংযমকে কাজে লাগিয়ে ইসরায়েল দেশটির সার্বভৌমত্বে আরও হস্তক্ষেপ করতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে এমন পরিস্থিতি চললে সিরিয়ার জনগণের কাছেও সরকারের গ্রহণযোগ্যতা কমে যেতে পারে।
সিরিয়ার সামরিক দুর্বলতা বাস্তব। ২০২৪ সালের শেষ দিকে সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের সেনাবাহিনী ভেঙে পড়ার পর ইসরায়েল দেশটির গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনাগুলোতে হামলা চালায়। এরপর নতুন সরকারকে অকার্যকর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং বিচ্ছিন্ন বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী থেকে নতুন জাতীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলার কাজ শুরু করতে হয়।
এ মুহূর্তে ইসরায়েলের আচরণ বদলে দিতে পারে-এমন সামরিক জবাব দেওয়ার সক্ষমতা সিরিয়ার আছে, তা কল্পনা করা কঠিন।
আল-শারা তাই অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তাঁর সরকার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন, নিরাপত্তা খাতের সংস্কার, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ পুনরুদ্ধার, বৈদেশিক সম্পর্ক উন্নত করা এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতির সঙ্গে সিরিয়াকে আবার যুক্ত করার কাজে মন দিয়েছে।
কিন্তু সিরিয়ার পুনর্গঠন বিশাল এক চ্যালেঞ্জ। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, যুদ্ধ ও ধ্বংসে ক্ষতিগ্রস্ত দেশটির অবকাঠামো পুনর্গঠনে প্রায় ২১৬ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হবে।
এত বড় প্রয়োজনের মুখে শুধু সামরিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করলেই রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। প্রয়োজন রাজস্ব, বিদ্যুৎ, কার্যকর প্রশাসন, ব্যাংকিং সুবিধা, বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক।
আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও আল-শারা কিছুটা সাফল্য পেয়েছেন। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়ার ওপর থাকা বিস্তৃত নিষেধাজ্ঞা কর্মসূচি তুলে নেয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে, যদিও কিছু ব্যক্তি ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা বহাল রয়েছে। গত ২৪ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়াকে ‘সন্ত্রাসবাদের পৃষ্ঠপোষক রাষ্ট্র’ তালিকা থেকেও সরিয়ে দেয়। এতে আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় সিরিয়ার স্বাভাবিক সংযোগ এবং বিনিয়োগের পথে আরেকটি বড় বাধা দূর হয়েছে।
দামেস্কের জন্য এসব পদক্ষেপ শুধু অর্থনৈতিক সুবিধা নয়। এগুলোর মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনা ও পুনর্গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় আন্তর্জাতিক সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
কারণেই ইসরায়েলের সঙ্গে বিরোধটি সিরিয়ার জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বছরের পর বছর আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতার পর এখন সিরিয়ার পুনর্গঠন অনেকটাই নির্ভর করছে আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও আর্থিক ব্যবস্থায় ফিরে আসার ওপর। ইসরায়েলের সঙ্গে বড় ধরনের সামরিক সংঘাতে জড়ালে বিনিয়োগকারীদের আস্থা নষ্ট হতে পারে, আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সিরিয়ার পুনঃসংযোগ বাধাগ্রস্ত হতে পারে এবং পুনর্গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক সমর্থনও দুর্বল হতে পারে।
এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছ থেকে সিরিয়ার ওপর নতুন রাজনৈতিক চাপও আসতে পারে। যদিও তার অর্থ এই নয় যে আগের মতো ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা আবার ফিরে আসবেই।
এখানেই সিরিয়ার কৌশলগত দ্বন্দ্বটি স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সংযত থাকা দামেস্ককে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় আন্তর্জাতিক পরিবেশ ধরে রাখতে সাহায্য করছে। কিন্তু একই সংযম ইসরায়েলকে সেই সামরিক ও কৌশলগত সক্ষমতা সীমিত করার সুযোগও দিচ্ছে, যা সিরিয়া এখন পুনর্গঠন করতে চাইছে।
নতুন সিরীয় সরকারের নেতৃত্ব একটি সশস্ত্র ইসলামপন্থী আন্দোলন থেকে উঠে আসায় ইসরায়েলের নিরাপত্তা উদ্বেগ রয়েছে। দামেস্কের সঙ্গে তুরস্কের সামরিক সম্পর্ক নিয়েও ইসরায়েলের উদ্বেগ বাড়ছে। কিন্তু ইসরায়েলের দাবি এখন শুধু সীমান্তের কাছে শত্রুভাবাপন্ন বাহিনী ঠেকানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সিরিয়ার কুনেইত্রা, দারা ও সুয়েইদা প্রদেশকে নিরস্ত্রীকরণের দাবি জানিয়েছেন। দামেস্কের দক্ষিণে সিরিয়ার নতুন সেনাবাহিনীর সদস্য মোতায়েনেরও বিরোধিতা করছে ইসরায়েল। তুরস্কের সঙ্গে সিরিয়ার সামরিক সহযোগিতার পরিধি সীমিত করারও চেষ্টা করছে দেশটি।
অর্থাৎ সিরিয়ার সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠন সীমিত করাই ইসরায়েলের অন্যতম লক্ষ্য বলে মনে হচ্ছে। ইসরায়েল বিষয়টিকে প্রতিরোধমূলক নিরাপত্তার দৃষ্টিতে দেখছে। আর দামেস্ক দেখছে সার্বভৌমত্বের দৃষ্টিতে।
কারণ একটি রাষ্ট্র তার সেনাবাহিনী কোথায় মোতায়েন করবে কিংবা কোন দেশের সঙ্গে সামরিক প্রশিক্ষণ নেবে-সেই সিদ্ধান্তও যদি স্বাধীনভাবে নিতে না পারে, তাহলে তার কৌশলগত স্বাধীনতা পুরোপুরি ফিরে এসেছে বলা যায় না।
আল-শারার কৌশলের বড় ঝুঁকি এখানেই। সিরিয়া এমন একটি সংঘাত এড়িয়ে চলছে, যা সামরিকভাবে জেতা তার পক্ষে কঠিন। একই সময়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভিত্তি পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে দেশটি। কিন্তু সেই পুনর্গঠিত সক্ষমতাই এখন ইসরায়েলি চাপের লক্ষ্য হয়ে উঠছে।
তবে শুধু সংযত থাকারও সীমা আছে। সিরিয়া আরব দেশগুলোর সমর্থন পাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার অংশ হিসেবে একটি কার্যকর সিরীয় রাষ্ট্র পুনর্গঠনে সমর্থন দিয়েছে। দামেস্ক ইসরায়েলের সঙ্গে একটি নিরাপত্তা চুক্তিতে পৌঁছানোর আগ্রহের কথাও একাধিকবার জানিয়েছে।
তারপরও ইসরায়েলি সামরিক অভিযান বন্ধ হয়নি।
আরেকটি ঝুঁকি রয়েছে সিরিয়ার অভ্যন্তরীণ জনমত নিয়ে। ইসরায়েলের একের পর এক হামলার পরও সরকার যদি অনির্দিষ্টকাল ধরে কোনো কার্যকর জবাব দিতে না পারে, তাহলে আল-শারার জনপ্রিয়তা এবং তাঁর সরকারের বৈধতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
২০২৫ সালে আরব সেন্টার ওয়াশিংটন ডিসির একটি বড় জরিপে দেখা যায়, ৭৪ শতাংশ সিরীয় ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়ার বিরোধিতা করেন। গোলান মালভূমি ফেরত না পেলে কোনো চুক্তি মেনে নেওয়ার বিরোধিতা করেন ৭০ শতাংশ। আর ৮৮ শতাংশ মনে করেন, ইসরায়েল সিরিয়ার নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি।
একই জরিপে ৬১ শতাংশ সিরীয় বলেছেন, বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্রনীতি তাঁদের মতামতের প্রতিফলন ঘটায়।
তবে এসব তথ্যের একটি সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। জরিপটি সাম্প্রতিক সংঘাতের আগের। ফলে সিরীয়রা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সামরিক প্রতিশোধ চান কি না, তা এই জরিপ থেকে জানা যায় না। এটি মূলত তাঁদের রাজনৈতিক অবস্থান ও গ্রহণযোগ্যতার সীমারেখা তুলে ধরে, যুদ্ধের দাবি নয়।
২০২৫ সালের আরব মতামত সূচকের বিভিন্ন দেশের জরিপেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা গেছে। জরিপে অংশ নেওয়া দেশগুলোতে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়ার বিরোধিতা ছিল ব্যাপক।
আল-আসাদদের শাসনামলেও সিরিয়া সাধারণত ইসরায়েলের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত এড়িয়ে চলেছে। তবে একই সময়ে ‘প্রতিরোধের’ আঞ্চলিক বলয়ের অংশ হিসেবে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছিল দামেস্ক। সরাসরি যুদ্ধ এড়িয়ে চলার পাশাপাশি মিত্রতা ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের মাধ্যমে তখন আঞ্চলিক প্রভাব ধরে রাখার চেষ্টা করা হতো।
আল-শারার সরকার ভিন্ন পথে হাঁটছে। তারা শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং একটি পুনর্গঠিত জাতীয় সেনাবাহিনীর ওপর জোর দিচ্ছে।
কিন্তু এই পথ আঞ্চলিক সার্বভৌমত্বের বিকল্প নয়। বরং সার্বভৌমত্ব কার্যকরভাবে প্রয়োগ করার সক্ষমতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা।
শেষ পর্যন্ত এই কৌশলকে ঘরে ও বাইরে সমর্থনযোগ্য রাখতে হলে পুনর্গঠিত রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার মাধ্যমে সিরিয়াকে নিজের ভূখণ্ড, নিরাপত্তা-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত এবং বৈদেশিক সম্পর্কের ওপর আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তা না হলে সংযমের নীতি একসময় কৌশলগত শক্তি না হয়ে দুর্বলতার প্রতীক হয়ে উঠতে পারে।
সূত্র: আলজাজিরা