সংবাদ শিরোনাম

জার্মান বিমানবন্দরে হামলার দায় রাশিয়ার: বার্লিন

 প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৩৪ পূর্বাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

জার্মান বিমানবন্দরে হামলার দায় রাশিয়ার: বার্লিন ছবি-সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

জার্মানির লিপজিগ-হালে বিমানবন্দরে গত মাসে বিস্ফোরকবোঝাই ড্রোন দিয়ে হামলার চেষ্টার জন্য রাশিয়াকে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়ী করেছে জার্মানি। দেশটির গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বলছে, বিমানবন্দরে পাওয়া ড্রোনটির প্রযুক্তি ও বিভিন্ন যন্ত্রাংশ রাশিয়ার ব্যবহৃত প্রযুক্তির সঙ্গে মিলে যায়।

মঙ্গলবার জার্মানির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলেকজান্ডার ডোব্রিন্ট বলেন, পুলিশি তদন্ত, হামলার ধরন এবং গোয়েন্দা তথ্য-সব মিলিয়ে লিপজিগ বিমানবন্দরে হামলার চেষ্টার সঙ্গে রাশিয়ার সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হয়েছে। তবে রাশিয়ার সঙ্গে ঘটনাটির সরাসরি যোগসূত্রের বিস্তারিত প্রমাণ এখনো প্রকাশ করেনি জার্মান সরকার।

গত ৪ আগস্ট সন্ধ্যায় ইউক্রেনের প্রতিষ্ঠান অ্যান্টোনভ এয়ারলাইন্সের একটি কার্গো বিমানের কাছে বিস্ফোরকবোঝাই একটি ড্রোন পাওয়া যায়। রানওয়ের কাছে কার্গো এলাকায় এক কর্মী ড্রোনটি দেখতে পেয়ে কর্তৃপক্ষকে জানান। এরপর পূর্ব জার্মানির স্যাক্সনি রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কার্গো কেন্দ্র লিপজিগ-হালে বিমানবন্দর সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়।


বোমা নিষ্ক্রিয়কারী বিশেষজ্ঞরা রোবট ব্যবহার করে ড্রোনটির বিস্ফোরক নিষ্ক্রিয় করেন। এ ছাড়া বিমানবন্দরের কাছে একটি উড়োজাহাজের সঙ্গে সংঘর্ষের পর দ্বিতীয় একটি ড্রোন ধ্বংস হওয়ার খবরও পাওয়া যায়।

ডোব্রিন্ট বলেন, ড্রোনটির বিন্যাস ও বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার যুদ্ধে ব্যবহৃত প্রযুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তাঁর ভাষায়, ড্রোনটি তৈরিতে উচ্চ মাত্রার কারিগরি দক্ষতা ব্যবহার করা হয়েছিল। তবে হামলাটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব অপেক্ষাকৃত নিম্নস্তরের এজেন্টদের দেওয়া হয়েছিল বলে মনে হচ্ছে। এসব ব্যক্তি রুশ রাষ্ট্রীয় সংস্থার হয়ে কাজ করছিলেন বলেও দাবি করেন তিনি।

তবে কোন রুশ সংস্থা এর সঙ্গে জড়িত ছিল, তা জানাননি জার্মান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

রাশিয়ার কনস্যুলেট বন্ধ করছে জার্মানি

রাশিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রকাশের পর পাল্টা পদক্ষেপ নিয়েছে জার্মানি। আগামী ১৮ সেপ্টেম্বর রাইন নদীর তীরের গুরুত্বপূর্ণ শহর বন-এ রাশিয়ার কনস্যুলেট বন্ধ করে দেওয়া হবে। বার্লিনে রুশ সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ‘রাশিয়ান হাউস’ও বন্ধ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে সেটি কবে বন্ধ হবে, তা জানানো হয়নি।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞার তালিকায় আরও রুশ নাগরিককে যুক্ত করার সুপারিশ করবে জার্মানি। রুশ নাগরিকদের প্রবেশের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করার বিষয়টিও বিবেচনা করছে বার্লিন। এ ঘটনায় জার্মান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রাশিয়ার রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছে।

অভিযোগ অস্বীকার মস্কোর

জার্মানির অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছে রাশিয়া। বার্লিনে রুশ দূতাবাস অভিযোগগুলোকে ‘অযৌক্তিক’ বলে অভিহিত করেছে এবং এর পরিণতি হবে বলে সতর্ক করেছে।

রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্জের সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন। তাঁর দাবি, অভ্যন্তরীণ সমস্যা ও জনসমর্থন কমে যাওয়ার বিষয় থেকে মানুষের দৃষ্টি সরাতেই জার্মানি মস্কোর দিকে আঙুল তুলছে। এমনকি ড্রোন হামলার ঘটনায় রাশিয়াকে ফাঁসাতে জার্মানি প্রমাণ সাজিয়ে থাকতে পারে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।

দাঁড়িয়েছে ন্যাটো মিত্ররা

রাশিয়ার বিরুদ্ধে জার্মানির অভিযোগকে সমর্থন করেছে পোল্যান্ড, ইতালি, যুক্তরাজ্য, সুইডেন ও চেক প্রজাতন্ত্রসহ ন্যাটোর কয়েকটি সদস্যদেশ।

চেক পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, রাশিয়ার এ ধরনের ‘হাইব্রিড কর্মকাণ্ড’ যখন ন্যাটোর কোনো একটি মিত্রকে লক্ষ্য করে, তখন সব মিত্রই ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।

ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লায়েন জানিয়েছেন, তিনি ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করবেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরাও এ ঘটনায় যৌথ প্রতিক্রিয়া প্রস্তুত করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

জার্মানির পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছে ইউক্রেন

রাশিয়ার বিরুদ্ধে জার্মানির নেওয়া পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছে ইউক্রেন। দেশটির রাষ্ট্রদূত ওলেক্সি মাকেইয়েভ জার্মানির প্রতিক্রিয়ার প্রশংসা করেছেন।

রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইউক্রেনের গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার জার্মানি। গত এপ্রিল মাসে দুই দেশ নিরাপত্তা সহযোগিতা চুক্তি করে। এর আওতায় ইউক্রেনের জন্য ক্ষেপণাস্ত্র কেনার অর্থায়ন এবং ড্রোন যৌথভাবে উৎপাদনের বিষয়ে সহযোগিতার কথা রয়েছে।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, দেশটির আকাশসীমা বেসামরিক বিমান চলাচলের জন্য ক্রমেই অনিরাপদ হয়ে উঠছে। রাশিয়া ও ইউক্রেন-উভয় পক্ষই যুদ্ধে ড্রোনের ব্যবহার বাড়াচ্ছে।

ইউরোপে রাশিয়ার ‘হাইব্রিড হামলা’

ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণাঙ্গ আগ্রাসন শুরুর পর থেকে ইউরোপে রাশিয়ার বিরুদ্ধে নাশকতা ও অন্যান্য গোপন কর্মকাণ্ডের অভিযোগ বাড়ছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের হিসাবে, ২০২২ সালের আগ্রাসনের পর ইউরোপে নাশকতা ও ক্ষতিকর কর্মকাণ্ডের প্রায় ২০০টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।

এসব ঘটনার মধ্যে সাইবার হামলা, গুপ্তচরবৃত্তি, অপতথ্য ছড়ানো, অগ্নিসংযোগ এবং অবকাঠামোয় হস্তক্ষেপের অভিযোগ রয়েছে।

২০২৪ সালের মার্চে পূর্ব লন্ডনের একটি গুদামে আগুন দেওয়ার ঘটনাও এর মধ্যে রয়েছে। ওই গুদামে ইউক্রেনের জন্য পাঠানো সহায়তা রাখা ছিল। এ ঘটনায় রাশিয়াসমর্থিত আধাসামরিক সংগঠন ওয়াগনার গ্রুপের সদস্যদের দায়ী করেছিলেন প্রসিকিউটররা।

এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে প্রায়ই ‘হাইব্রিড হামলা’ বলা হয়। সরাসরি যুদ্ধের পর্যায়ে না গিয়েও এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ভয়, অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা তৈরি করা হয়।

হামলার অভিযোগ ঘিরে উত্তেজনা কেন

জার্মানির দাবি, লিপজিগ বিমানবন্দরে হামলার চেষ্টা ইউক্রেনকে সমর্থন করার ক্ষেত্রে দেশটির রাজনৈতিক অবস্থান দুর্বল করার উদ্দেশ্যে করা হয়েছে। ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ চার বছরের বেশি সময় ধরে চলছে। ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারাও সতর্ক করেছেন, আসন্ন শীত তাদের জন্য এখন পর্যন্ত সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোর একটি হতে পারে।

এর মধ্যে জার্মানির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ সময় চলছে। আগামী ৬ সেপ্টেম্বর দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় স্যাক্সনি-আনহাল্ট প্রদেশে নির্বাচন হবে। ওই নির্বাচনে উগ্র ডানপন্থী অলটারনেটিভ ফর জার্মানি (AfD) ভালো ফল করার আশা করছে।

যুদ্ধ নিয়ে জনমনে তৈরি হওয়া ক্লান্তিকে কাজে লাগিয়ে প্রচার চালাচ্ছে দলটি। রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের পক্ষে অবস্থান নেওয়া AfD ইউক্রেনকে জার্মানির সহায়তারও সমালোচনা করে আসছে। নির্বাচনের আগে জনমত জরিপগুলোতে দলটি এগিয়ে রয়েছে।

সূত্র: আলজাজিরা