আজ ভাষণ দেবেন শেখ হাসিনা, নজর রাজনৈতিক বার্তায়
অনলাইন ডেস্ক:
ভারতের দিল্লিতে প্রায় দুই বছর নির্বাসিত জীবন কাটানোর পর আজ ভার্চ্যুয়ালি জনসমক্ষে আসছেন বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দক্ষিণ এশিয়ার ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব (এফসিসি) আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ভিডিও বার্তার মাধ্যমে তিনি বক্তব্য দেবেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানে তাঁর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় এবং আওয়ামী লীগের কয়েকজন শীর্ষ নেতাও অংশ নেবেন।
‘শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন’ শিরোনামের এই অনুষ্ঠান ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা চলছে। বিভিন্ন পর্যবেক্ষকের ধারণা, শেখ হাসিনা তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং দেশে ফেরার পরিকল্পনা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিতে পারেন।
২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর শেখ হাসিনা ভারত চলে যান। পরবর্তী সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে আন্দোলন দমনে নিরাপত্তা বাহিনীকে গুলি চালানোর নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ২০২৫ সালে অনুপস্থিত অবস্থায় তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। শেখ হাসিনা এই রায়কে শুরু থেকেই আইনগতভাবে অকার্যকর বলে দাবি করে আসছেন।
সরকারি তদন্তের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আন্দোলন চলাকালে প্রায় ১ হাজার ৪০০ জন নিহত এবং ২০ হাজারের বেশি মানুষ আহত হন। পাশাপাশি তাঁর দীর্ঘ শাসনামলে জোরপূর্বক গুমের প্রায় ১ হাজার ৫০০ ঘটনার অভিযোগও তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে। এসব অভিযোগের বেশির ভাগই তিনি অস্বীকার করেছেন।
বাংলাদেশ সরকার শেখ হাসিনার বক্তব্য দেশীয় গণমাধ্যমে প্রচার না করার নির্দেশ দিয়েছে। তাঁর সহযোগী আবু ওবায়দা আরিন এ সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে বলেন, ভিন্নমত দমনের চেষ্টা দেশের সীমানার বাইরে মানুষের কণ্ঠ থামাতে পারবে না।
এর আগে চলতি বছরের জানুয়ারিতে দিল্লি থেকে দেওয়া এক অডিও ভাষণে শেখ হাসিনা তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান মুহাম্মদ ইউনূসের কঠোর সমালোচনা করেছিলেন। সেই বক্তব্য অনলাইনে এক লাখের বেশি মানুষ শুনেছিলেন।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শেখ হাসিনার নতুন এই বক্তব্য নিয়েও আপত্তি জানিয়েছে। সরকারের ভাষ্য, ভারতে অবস্থান করে তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্য দুই দেশের সম্পর্কের জন্য সংবেদনশীল বিষয়। তবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্পষ্ট করেছে, অনুষ্ঠানটি একটি বেসরকারি গণমাধ্যম-সংশ্লিষ্ট সংগঠন আয়োজন করছে এবং এতে ভারত সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা বা সমর্থন নেই।
গত মাসে শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এএফপিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানান, তিনি আগামী ডিসেম্বর দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনা করছেন। তিনি বলেন, গ্রেপ্তার বা মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকি সম্পর্কে তিনি অবগত, তবুও দেশের মানুষের আহ্বানে ফিরতে চান।
বিশ্লেষকদের মতে, আজকের বক্তব্যে তিনি দেশে ফেরার পরিকল্পনা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করতে পারেন। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সংগঠিত করা এবং দলের ভবিষ্যৎ কৌশল তুলে ধরারও চেষ্টা থাকতে পারে।
নয়াদিল্লিভিত্তিক প্রতিরক্ষা ও কৌশল বিশ্লেষক স্মৃতি পট্টনায়েকের মতে, শেখ হাসিনার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নতুন দিকনির্দেশনা দেওয়ার কৌশল হতে পারে। তাঁর ভাষায়, দেশে ফিরে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়ার সিদ্ধান্ত দলটির পক্ষ থেকে রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।
ভারতের ওপি জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক শ্রীরাধা দত্ত মনে করেন, শেখ হাসিনার বক্তব্য মূলত সমর্থকদের উজ্জীবিত করার উদ্দেশ্যেই হতে পারে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, তাঁর প্রত্যাবর্তনের উদ্যোগ বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করতে পারে, বিশেষ করে ২০২৪ সালের আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর আবেগ এখনও প্রবল।
এদিকে শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য বাংলাদেশ একাধিকবার ভারতের কাছে প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানিয়েছে। নয়াদিল্লি জানিয়েছে, বিষয়টি দুই দেশের বিদ্যমান প্রত্যর্পণ চুক্তি ও আইনি প্রক্রিয়ার আলোকে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
ভারতের অনেক বিশ্লেষকের মতে, রাজনৈতিক চরিত্রের অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রত্যর্পণ চুক্তিতে বিশেষ বিধান থাকায় নয়াদিল্লি এখন পর্যন্ত শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়নি। তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ঢাকা ও নয়াদিল্লির সম্পর্কের উন্নতির প্রেক্ষাপটে এই ইস্যু কূটনৈতিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে রয়েছে।
সূত্র: আলজাজিরা