সংবাদ শিরোনাম

৩৬ জুলাই’র দুই বছর: স্মৃতিতে বিজয়, বাস্তবে প্রত্যাশার চাপ

 প্রকাশ: ০৫ অগাস্ট ২০২৬, ০২:২২ অপরাহ্ন   |   জাতীয়

৩৬ জুলাই’র দুই বছর: স্মৃতিতে বিজয়, বাস্তবে প্রত্যাশার চাপ

 অনলাইন ডেস্ক:

রক্তাক্ত জুলাইয়ের পথ পেরিয়ে ৫ আগস্ট এসেছিল বিজয়ের বার্তা নিয়ে। ছাত্র-জনতার নজিরবিহীন আন্দোলনের মুখে ২০২৪ সালের এই দিনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশত্যাগের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বাস্তবতায় ঘটে বড় পরিবর্তন। সেই দিনটি এখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। কিন্তু গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পর দাঁড়িয়ে প্রশ্ন উঠছেযে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে মানুষ রাজপথে নেমেছিল, তার কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে?

২০২৪ সালের জুনে সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা পুনর্বহালের উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্তকে ঘিরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে অসন্তোষের জন্ম, তা অল্প সময়ের মধ্যেই বৃহত্তর আন্দোলনে রূপ নেয়। জুলাইয়ের মাঝামাঝি এসে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। ১৬ জুলাই রংপুরে আবু সাঈদের মৃত্যুর ঘটনা আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করে। তার আত্মত্যাগে ক্ষোভ আরও তীব্র হয়ে ওঠে এবং শিক্ষার্থীদের কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত হতে শুরু করেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের কঠোর পদক্ষেপ, ইন্টারনেট বন্ধ এবং কারফিউ জারির পরও আন্দোলনের গতি থামেনি। বরং একপর্যায়ে তা সরকারবিরোধী গণআন্দোলনের রূপ নেয়। ৩ আগস্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে এক দফা দাবি ঘোষণার পর আন্দোলনকারীরা ৫ আগস্ট ‘লং মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ঘোষণা করেন। সেই কর্মসূচির দিনেই দেশের রাজনীতিতে আসে বড় পরিবর্তন।

পরিবর্তনের পর নতুন পথের সন্ধান

৫ আগস্টের পর রাষ্ট্র পরিচালনায় আসে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে প্রায় ১৮ মাস দেশ পরিচালনার পর নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি ক্ষমতায় আসে এবং তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন। নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রশাসন, বিচার বিভাগসহ রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

তবে এসব উদ্যোগ কতটা কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে পেরেছে, তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করেন, রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সংস্কারের আলোচনা ও কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হলেও পুরোনো প্রশাসনিক সংস্কৃতি ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক চর্চার পুরোপুরি অবসান এখনো হয়নি।

যে প্রত্যাশা ছিল জুলাইয়ের

জুলাইয়ের আন্দোলনের অন্যতম প্রধান আকাঙ্ক্ষা ছিল বৈষম্যহীন রাষ্ট্র, ন্যায়বিচার, জবাবদিহি ও মানুষের মর্যাদা নিশ্চিত করা। আন্দোলনকারীদের প্রত্যাশা ছিল শুধু একটি সরকারের পরিবর্তন নয়; বরং রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতিতেই মৌলিক সংস্কার।

কিন্তু দুই বছর পরও মানুষের দৈনন্দিন জীবনে কাঙ্ক্ষিত স্বস্তি পুরোপুরি ফিরে আসেনি। বাজারে পণ্যমূল্যের চাপ, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা, প্রশাসনিক জটিলতা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন এখনো রয়েছে। এসব কারণে জুলাইয়ের আন্দোলনে সরাসরি যুক্ত থাকা অনেক তরুণের মধ্যেও হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।

ঐক্যের জায়গায় বিভাজন

গণ-অভ্যুত্থানের সময় যে ছাত্রসমাজকে একটি অভিন্ন দাবির পতাকাতলে দেখা গিয়েছিল, দুই বছর পর তাদের মধ্যে তৈরি হয়েছে দৃশ্যমান বিভাজন। আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কদের অনেকে ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েছেন। কেউ সক্রিয় রাজনীতিতে, কেউ সংগঠনভিত্তিক কর্মকাণ্ডে, আবার কেউ রয়েছেন অনেকটাই আড়ালে।

আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত তরুণদের একটি অংশ মনে করেন, জুলাইয়ের আত্মত্যাগের মূল শিক্ষা ছিল ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ভেঙে একটি জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা। কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ও ক্ষমতার সমীকরণে সেই বৃহত্তর লক্ষ্য অনেক সময় আড়ালে পড়ে যাচ্ছে।

সরকার বদল নয়, কাঠামোর পরিবর্তন চান মানুষ

দুই বছর আগে ৫ আগস্টের বিজয় মানুষের মধ্যে যে প্রত্যাশার জন্ম দিয়েছিল, তার কেন্দ্রে ছিল একটি নতুন রাষ্ট্রের স্বপ্ন। সেই স্বপ্নে ছিল ন্যায়বিচার, সমতা, মানবিক মর্যাদা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং জবাবদিহিমূলক শাসন।

আজকের বাস্তবতায় সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশের প্রশ্নশুধু ক্ষমতার পালাবদলই কি জুলাইয়ের চূড়ান্ত অর্জন? নাকি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও প্রশাসনিক কাঠামোয় দৃশ্যমান পরিবর্তনই হবে সেই আন্দোলনের প্রকৃত সাফল্যের মাপকাঠি?

চব্বিশের জুলাই এখন কেবল একটি ঐতিহাসিক অধ্যায় নয়; তরুণ প্রজন্মের কাছে এটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর প্রতীক। দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিতে তাই স্মৃতিচারণের পাশাপাশি সামনে আসছে ভবিষ্যতের হিসাবও।

আবু সাঈদ, মুগ্ধ, রিয়া গোপসহ আন্দোলনে প্রাণ হারানোদের আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে রাজপথের সেই সময়ের যোদ্ধাদের প্রত্যাশাজুলাইয়ের রক্ত যেন কেবল সরকার পরিবর্তনের ইতিহাস হয়ে না থাকে। তাদের দাবি, যে বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক বাংলাদেশের স্বপ্নে মানুষ জীবন দিয়েছিল, রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি স্তরে সেই স্বপ্নের প্রতিফলন ঘটুক। 

Advertisement
Advertisement
Advertisement