শাহজালাল বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনালে নতুন অনিয়মের অভিযোগ: ৫০০ টাকার গাছের দাম দেখানো হয়েছে ১ লাখ
অনলাইন ডেস্ক:
হযরত
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বহুল প্রতীক্ষিত থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পে
আবারও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে। এবার অভিযোগ উঠেছে, বাজারে ২০০ থেকে ৫০০
টাকায় পাওয়া যায় এমন গাছের চারা প্রকল্পে একেকটির মূল্য সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা
পর্যন্ত দেখানো হয়েছে। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর আলোচনায় ফিরে এসেছে বহুল আলোচিত
'বালিশ-কাণ্ড'-এর স্মৃতি।
মহাহিসাব
নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) বিশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পে
প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়াই প্রায় ৩ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। অতিরিক্ত
বিল, অনুমোদনবিহীন ভেরিয়েশন এবং চুক্তির বাইরে নানা খাতে অর্থ পরিশোধের তথ্যও উঠে
এসেছে প্রতিবেদনে। এসব ব্যয় এখন পোস্ট-ফ্যাক্টো অনুমোদনের মাধ্যমে বৈধ করার উদ্যোগ
নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।
'পোস্ট-ফ্যাক্টো
অনুমোদন' নিয়ে উদ্বেগ
ট্রান্সপারেন্সি
ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন,
অনিয়ম শনাক্ত হওয়ার পর সেগুলোকে পরবর্তী সময়ে অনুমোদনের মাধ্যমে বৈধতা দেওয়া হলে
তা কার্যত দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেওয়ার শামিল হবে। এতে জবাবদিহির সংস্কৃতি
ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
অন্যদিকে,
বিমান চলাচল বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলমের মতে, এসব ব্যয় বৈধ করার পরিবর্তে
স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের চিহ্নিত করে অতিরিক্ত অর্থ উদ্ধার এবং প্রয়োজনীয়
আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। অন্যথায় সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম বন্ধ করা কঠিন
হবে।
৫০০
টাকার গাছ, বিল করা হয়েছে লাখ টাকায়
সূত্র
বলছে, থার্ড টার্মিনালের সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য ঝাউ, কৃষ্ণচূড়া, কাঠগোলাপসহ বিভিন্ন
গাছ লাগানো হয়েছে। প্রকল্পের নথিতে এসব গাছের একেকটির মূল্য ৫ হাজার থেকে ১ লাখ
টাকা পর্যন্ত দেখানো হয়েছে।
তবে
বিমানবন্দরসংলগ্ন একাধিক নার্সারির মালিক জানিয়েছেন, একই ধরনের গাছের বাজারদর সর্বোচ্চ
৫০০ টাকার বেশি নয়। শুধু গাছ কেনার জন্যই প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে।
পাশাপাশি গাছের পরিচর্যার নামে আরও প্রায় ৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা খরচ দেখানো হয়েছে।
পুরোনো
জলাশয়কে 'নতুন পুকুর' দেখিয়ে ১০ কোটি টাকা
নিরীক্ষা
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রকল্পে নতুন পুকুর নির্মাণের নামে ঠিকাদারকে প্রায় ১০
কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। কিন্তু গুগল আর্থের পুরোনো স্যাটেলাইট চিত্র
বিশ্লেষণে দেখা যায়, সেখানে আগে থেকেই একটি জলাশয় ছিল। সেটি সামান্য সংস্কার করেই
নতুন পুকুর হিসেবে ব্যয় দেখানো হয়েছে।
এ ছাড়া
চুক্তি অনুযায়ী মাটি প্রায় সাড়ে ছয় কিলোমিটার দূরে ফেলার কথা থাকলেও বাস্তবে
অধিকাংশ মাটি দুই কিলোমিটারের মধ্যেই ফেলা হয়েছে। অথচ দীর্ঘ দূরত্বে পরিবহনের বিল
দেখিয়ে প্রায় ৮৩ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।
উদ্বোধনের
জন্যই ৪৪ কোটি টাকা ব্যয়
প্রতিবেদনে
উল্লেখ করা হয়েছে, প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার আগেই আংশিক উদ্বোধনের আয়োজন করা হয়। ওই
অনুষ্ঠানে ফিতা কাটা ও সংশ্লিষ্ট আয়োজনের জন্য প্রায় ৪৪ কোটি টাকা ব্যয় দেখানো
হয়েছে, যদিও মূল চুক্তিতে এ ধরনের ব্যয়ের কোনো উল্লেখ ছিল না।
এ ছাড়া
ডিজেল পাম্প, ইউপিএস, জ্বালানি তেল, নকশাবহির্ভূত ভবনের অর্থ পরিশোধ, পরামর্শকদের
অতিরিক্ত বিল এবং নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ করার নামে ঠিকাদারকে আরও শত শত কোটি টাকা
অতিরিক্ত পরিশোধের তথ্যও প্রতিবেদনে এসেছে।
অনুমোদনের
সীমা ছাড়িয়ে ব্যয়
বিশেষ
নিরীক্ষায় বলা হয়েছে, অতিরিক্ত কাজের ক্ষেত্রে প্রকল্প কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া
সর্বোচ্চ ১ শতাংশ ব্যয়ের সুযোগ থাকলেও এই প্রকল্পে প্রায় ২৩ শতাংশ পর্যন্ত
অতিরিক্ত ব্যয় করা হয়েছে। ৬৩০টি আইটেমে পরিবর্তন এনে প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়াই
প্রায় ৩ হাজার ২০০ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।
ব্যয়
বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা
২০১৭ সালে
অনুমোদিত এই প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১৯ সালে। শুরুতে ব্যয় ধরা হয়েছিল
প্রায় ১৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। পরে একাধিক সংশোধনের মাধ্যমে তা বেড়ে প্রায় ২২
হাজার কোটি টাকায় পৌঁছে।
জাপানের
মিতসুবিশি ও ফুজিটা এবং দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাংয়ের সমন্বয়ে গঠিত এভিয়েশন ঢাকা
কনসোর্টিয়াম (এডিসি) প্রকল্পটির নির্মাণকাজ পরিচালনা করে। প্রকল্পের বড় অংশের
অর্থায়ন করেছে জাইকা।
তদন্তের
আশ্বাস
বেসামরিক
বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেছেন, থার্ড
টার্মিনাল প্রকল্পে যেসব অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে, সেগুলো তদন্ত করে
দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কে বা কারা ভুয়া ভেরিয়েশন করেছে, কত
অর্থ অনিয়ম হয়েছে এবং কারা জড়িত—সবকিছুই
খতিয়ে দেখা হবে।
তিনি
জানান, প্রকল্প-সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য একটি অ্যামিকেবল সেটেলমেন্ট কমিটি
গঠন করা হলেও দুর্নীতির অভিযোগ কোনোভাবেই আপসের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হবে না।
তদন্ত
নিয়ে প্রশ্ন
এদিকে
সংশ্লিষ্ট মহলের অভিযোগ, অনিয়মের অভিযোগে যাদের বিরুদ্ধে প্রশ্ন উঠেছে, তাদের
কয়েকজনকেই তদন্ত-সংশ্লিষ্ট কমিটিতে রাখা হয়েছে। এতে তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে সংশয়
তৈরি হয়েছে।
সাবেক
বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) মোহাম্মদ মফিদুর রহমান বলেন, প্রকল্পের
নকশা, ব্যয়ের হিসাব, ভেরিয়েশন এবং মূল্য নির্ধারণে বিদেশি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের
গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তাই নিরীক্ষায় উত্থাপিত প্রতিটি বিষয় প্রকল্পের নথি ও
চুক্তির আলোকে যাচাই করে নিরপেক্ষ তদন্ত করা প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, প্রকল্পের বাকি কাজ শেষ করার পাশাপাশি অনিয়মের অভিযোগেরও স্বচ্ছ তদন্ত হওয়া উচিত। তাদের ভাষ্য, উন্নয়নকাজ চলতে পারে নিজের গতিতে, তবে জনগণের অর্থের অপচয় ও অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনতেই হবে।