নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার দ্রুত বিচার: হাইকোর্টে বিশেষ বেঞ্চ গঠন, ন্যায়বিচারে নতুন দিগন্ত

 প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২৬, ০৮:৫১ অপরাহ্ন   |   জাতীয়

নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার দ্রুত বিচার: হাইকোর্টে বিশেষ বেঞ্চ গঠন, ন্যায়বিচারে নতুন দিগন্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক:

রাজধানীর পল্লবীতে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার শিশু রামিসা আক্তারের ঘটনা গোটা দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। বিচারিক আদালতে দ্রুত রায় ঘোষণা করে দুই আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলেও সাধারণ মানুষের মনে একটি প্রশ্ন থেকেই গিয়েছিল উচ্চ আদালতে দীর্ঘসূত্রতার কারণে এই বিচারও কি বছরের পর বছর ঝুলে থাকবে?

সেই উদ্বেগের মধ্যেই দেশের বিচারব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের আওতাভুক্ত মামলাগুলোর আপিল ও ডেথ রেফারেন্স দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে একটি বিশেষ বেঞ্চ গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী। আগামী রোববার থেকে এই বেঞ্চ আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু করবে।

অ্যাটর্নি জেনারেলের প্রস্তাবে দ্রুত সিদ্ধান্ত

গত রবিবার আপিল বিভাগের এজলাসে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা রুহুল কুদ্দুস কাজল নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, নিম্ন আদালতে মৃত্যুদণ্ডের রায় হলেও তা চূড়ান্ত নয়; হাইকোর্টের অনুমোদন ছাড়া সেই রায় কার্যকর করা যায় না।

তাঁর মতে, বহু আলোচিত মামলার বিচারিক রায় ঘোষণার পরও দীর্ঘদিন উচ্চ আদালতে ঝুলে থাকায় ভুক্তভোগী পরিবার ও সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়। এই বাস্তবতা তুলে ধরার পরই প্রধান বিচারপতি বিশেষ বেঞ্চ গঠনের সিদ্ধান্ত নেন।

শুধুই নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার শুনানি

নতুন গঠিত বেঞ্চটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের অধীন মামলাগুলোই শুনবে। শিশু রামিসা, আসিয়া কিংবা রসু খাঁর মতো আলোচিত মামলার পাশাপাশি এ ধরনের অন্যান্য মামলার আপিল ও ডেথ রেফারেন্সও এই বেঞ্চে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিষ্পত্তি করা হবে।

আইন সংশ্লিষ্টদের মতে, বিশেষায়িত এই বেঞ্চ গঠনের ফলে বিচারপ্রক্রিয়ায় গতি আসবে এবং দীর্ঘদিন ধরে বিচারপ্রত্যাশীদের যে অপেক্ষা করতে হয়, তা অনেকাংশে কমে যাবে।

রাষ্ট্রপক্ষের বিশেষ টিম গঠন

বিশেষ বেঞ্চের কার্যক্রমকে কার্যকর করতে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় থেকেও নেওয়া হয়েছে পৃথক উদ্যোগ। ল’ অফিসারদের সমন্বয়ে একটি বিশেষ টিম গঠন করা হয়েছে, যারা শুধু নারী ও শিশু নির্যাতন মামলাগুলো পরিচালনায় দায়িত্ব পালন করবেন।

অ্যাটর্নি জেনারেল জানিয়েছেন, রাষ্ট্রপক্ষের আইন কর্মকর্তাদের কোনো মামলায় অযৌক্তিক সময় প্রার্থনা বা শুনানি পেছানোর আবেদন না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ফলে মামলাগুলোর দ্রুত শুনানি ও নিষ্পত্তি নিশ্চিত করা সহজ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

আদালতের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ

আইন বিশেষজ্ঞরা এই সিদ্ধান্তকে দেশের বিচারব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখছেন। তাঁদের মতে, দ্রুত বিচার নিশ্চিত হলে অপরাধীদের শাস্তি কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি দুর্বল হবে।

অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা পুনরুদ্ধারে প্রধান বিচারপতির এই উদ্যোগ দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

আলোচিত নয়, সব অপরাধের বিচারই জরুরি

তিনি আরও বলেন, শুধু আলোচিত মামলাগুলোর প্রতি মনোযোগ দিলেই হবে না; দেশের প্রতিটি অপরাধের বিচার সমান গুরুত্বের সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে। দ্রুত তদন্ত, বিচার এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব।

বিশ্লেষকদের মতে, নারী ও শিশু নির্যাতনের মতো সংবেদনশীল মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ বেঞ্চ গঠন বিচারপ্রার্থীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার প্রতিফলন। এর মাধ্যমে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো যেমন দ্রুত ন্যায়বিচার পাওয়ার আশা করতে পারবে, তেমনি বিচারব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাও আরও শক্তিশালী হবে।
Advertisement
Advertisement
Advertisement