সংবাদ শিরোনাম

রেকর্ড চামড়ার জোয়ার সাভারে: নির্ঘুম রাতে ব্যস্ত ট্যানারিপল্লী, লক্ষ্য ১ কোটি

 প্রকাশ: ২৯ মে ২০২৬, ০৯:০০ পূর্বাহ্ন   |   জাতীয়

রেকর্ড চামড়ার জোয়ার সাভারে: নির্ঘুম রাতে ব্যস্ত ট্যানারিপল্লী, লক্ষ্য ১ কোটি

 প্রতিবেদক, সাভার:

ত্যাগের মহিমায় দেশজুড়ে উদযাপিত ঈদ-উল-আজহার প্রথম দিনেই ঢাকার সাভারের চামড়া শিল্প নগরীতে (বিসিক) শুরু হয়েছে কাঁচা চামড়া সংগ্রহের বিশাল কর্মযজ্ঞ। ঈদের আনন্দ ছাপিয়ে এখন ট্যানারিপল্লীর সর্বত্র উৎসবমুখর ব্যস্ততা। রাজধানী ও এর আশপাশের এলাকা থেকে একের পর এক চামড়াবাহী ট্রাকের অবিরাম স্রোতে মুখর হয়ে উঠেছে শিল্প নগরীর প্রতিটি গলি। প্রথম দিনেই এখানে প্রবেশ করেছে ২ লাখ ২২ হাজারেরও বেশি কাঁচা চামড়া। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আভাস দিয়েছেন, কোরবানি ও চামড়া সংগ্রহের এই ধারা আগামী দুই থেকে তিন দিন আরও প্রবল বেগে বাড়বে, যা দেশের চামড়া খাতের অর্থনীতিতে এক নতুন গতি সঞ্চার করবে।

বৃহস্পতিবার ভরদুপুর থেকেই সাভারের ট্যানারি এলাকায় শুরু হয় মূল তৎপরতা। বেলা সাড়ে ১২টার দিকে কোরবানির পশুর চামড়াবাহী প্রথম গাড়িটি প্রধান ফটক দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতেই যেন বেজে ওঠে মৌসুমের শুরুর ঘণ্টা। এরপর সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে ট্রাকের সারি। দুপুরের পর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত সাভার বিসিক কার্যালয়ের সংগৃহীত তথ্যানুযায়ী, প্রায় ৮৭০টি ট্রাকে করে মোট ২ লাখ ২২ হাজার ২৩৩টি কাঁচা চামড়া শিল্প নগরীতে এসে পৌঁছায়। এর মধ্যে সিংহভাগই ছিল গরু ও মহিষের চামড়া, যার সংখ্যা ২ লাখ ১৪ হাজার ৩১৩টি। আর ছাগল ও ভেড়ার চামড়া এসেছে ৭ হাজার ৯২০টি।

সরেজমিনে শিল্প নগরী ঘুরে দেখা যায় এক বিশাল ও সুশৃঙ্খল কর্মযজ্ঞের চিত্র। রক্তমাখা কাঁচা চামড়া যাতে গরমে নষ্ট না হয়ে যায়, সেজন্য ট্রাক থেকে নামানোর পরপরই শ্রমিকরা দ্রুততার সঙ্গে তাতে লবণ মাখিয়ে সংরক্ষণের কাজে লেগে যান। কোথাও কোনো বিশৃঙ্খলা বা দীর্ঘ যানজটের চিরচেনা ভোগান্তি এবার চোখে পড়েনি। মূল ফটক থেকে শুরু করে প্রতিটি কারখানার প্রবেশদ্বার পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল বেশ নিয়ন্ত্রিত। শ্রমিক, আড়তদার ও ট্যানারি মালিকদের এই যৌথ তৎপরতায় পুরো এলাকা রূপ নিয়েছে এক বিশাল কর্মযজ্ঞের চত্বরে।

বিসিকের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মেহরাজুল মাইয়ান এই বিশাল ব্যবস্থাপনার সার্বিক চিত্র তুলে ধরে জানান, ঈদের এই অতিরিক্ত চাপ সামাল দিতে সরকার এবং স্থানীয় প্রশাসন এবার আগে থেকেই ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছিল। বিসিক, শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, জেলা ও স্থানীয় প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত তদারকির কারণেই এবার চামড়া পরিবহন ও আনলোডিং প্রক্রিয়া অত্যন্ত মসৃণ হয়েছে। কাঁচা চামড়া যাতে দ্রুত প্রক্রিয়াজাত করা যায়, সেজন্য ট্যানারিগুলোর ভেতরে পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহসহ অন্যান্য সব ধরনের প্রযুক্তিগত ও লজিস্টিক সহায়তা নিশ্চিত করা হয়েছে।

দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান এই চালিকাশক্তিকে ঘিরে ট্যানারি মালিকদের মধ্যেও এবার ব্যাপক উৎসাহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক সম্পর্কের সূত্র ধরে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সরাসরি ট্যানারিতে চামড়া সরবরাহ করছেন ব্যবসায়ীরা। আজমীর লেদারের মালিক মো. শহিদুল্লাহর মতো অনেক উদ্যোক্তাই এবার বড় লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে মাঠে নেমেছেন। তিনি জানান, শুধু তাদের কারখানাতেই এবার প্রায় ২০ হাজার পিস চামড়া কেনার পরিকল্পনা রয়েছে এবং মৌসুমের শুরুতেই কয়েক হাজার পিস চামড়া চলেও এসেছে।

কাঁচা চামড়া বেচাকেনার আসল জমজমাট রূপটি প্রকাশ পায় মূলত রাতের ভাগে। বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সাধারণ সম্পাদক ও সমতা লেদারের মালিক মো. মিজানুর রহমান পুরো খাতের একটি সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরে বলেন, এ বছর দেশজুড়ে প্রায় ১ কোটি পিস কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহের মহতী লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। যেহেতু রাতের বেলাতেই চামড়ার বড় বড় চালান এবং দূর-দূরান্তের ট্রাকগুলো সাভারে এসে পৌঁছায়, তাই পুরো সাভার চামড়া শিল্প নগরী এখন এক নির্ঘুম রাত পার করছে। আগামী কয়েকদিন এই কর্মব্যস্ততা ও উৎসবের আমেজ দেশীয় চামড়া শিল্পের ভবিষ্যৎ আরও সমৃদ্ধ করবে বলে আশা করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।