সংবাদ শিরোনাম

বৃষ্টি উপেক্ষা করে লাখো প্রাণের স্পন্দন, নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তায় শোলাকিয়ায় সম্পন্ন ১৯৯তম ঈদ জামাত

 প্রকাশ: ২৮ মে ২০২৬, ০৩:৩০ অপরাহ্ন   |   জাতীয়

বৃষ্টি উপেক্ষা করে লাখো প্রাণের স্পন্দন, নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তায় শোলাকিয়ায় সম্পন্ন ১৯৯তম ঈদ জামাত

প্রতিবেদক, কিশোরগঞ্জ :

​ঐতিহাসিক কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দান বরাবরের মতোই এবারও এক পরম ভক্তি ও ধর্মীয় সম্প্রীতির মহোৎসবে রূপ নিয়েছিল। তবে এবারের ঈদুল আজহার ১৯৯তম জামাতটি ছিল অন্যরকম এক পরীক্ষার। সকাল থেকেই আকাশ ভেঙে নেমেছিল মুষলধারে বৃষ্টি। বৈরী আবহাওয়া আর প্রবল বৃষ্টির ঝাপটাকে উপেক্ষা করেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা লাখো মুসলিম উম্মাহর ঢল নামে এই ঐতিহাসিক মাঠে। কোনো বাধাই যেন সৃষ্টিকর্তার দরবারে হাজিরা দেওয়ার এই আকুলতাকে দমাতে পারেনি। ছাতা মাথায় কিংবা সিক্ত শরীরে, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লাখো মানুষ মেতে ওঠেন ত্যাগের মহিমায়।

​ঠিক সকাল ৯টায় যখন জামাত শুরু হয়, তখন পুরো মাঠ কানায় কানায় পূর্ণ। এবারের এই বৃহত্তম জামাতে ইমামতি করেন প্রখ্যাত আলেম মুফতি আবুল খায়ের মো. ছাইফুল্লাহ। তাঁর সুমধুর কণ্ঠে আল্লাহর দরবারে শান্তি, সমৃদ্ধি ও মানবজাতির কল্যাণে আখেরি মোনাজাত করা হয়। দূর-দূরান্ত থেকে আসা মুসল্লিদের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে বাংলাদেশ রেলওয়ের পক্ষ থেকে 'শোলাকিয়া এক্সপ্রেস' নামে বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল, যা ভোর থেকেই মুসল্লিদের নিয়ে কিশোরগঞ্জ স্টেশনে এসে পৌঁছায়। বংশ পরম্পরায় এই মাঠে নামাজ আদায় করছেন এমন অনেক প্রবীণ মুসল্লি জানান, শোলাকিয়ার এই সুবিশাল জামাতে নামাজ পড়লে বেশি সওয়াব হাসিল হয়—এমন গভীর বিশ্বাস ও আত্মিক টানেই তারা প্রতি বছর সব কষ্ট উপেক্ষা করে এখানে ছুটে আসেন।

​ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে জানা যায়, আজ থেকে প্রায় দুই শতাব্দী আগে ১৮২৮ সালে এই মাঠে প্রথম বড় আকারের ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে একসঙ্গে এক লাখ ২৫ হাজার বা 'সোয়া লাখ' মুসল্লি কাতারবন্দি হয়েছিলেন। সেই থেকে লোকমুখে মাঠের নাম ছড়ায় ‘সোয়া লাখিয়া', যা কালের বিবর্তনে আজ বিশ্বজুড়ে 'শোলাকিয়া' নামে সমাদৃত। এবারের এই ঐতিহাসিক ক্ষণে সাধারণ মানুষের সাথে শামিল হয়েছিলেন কিশোরগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. মাজহারুল ইসলাম, কিশোরগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য মজিবুর রহমান ইকবাল, জেলা পরিষদের প্রশাসক খালেদ সাইফুল্লাহ সোহেল এবং জেলার পুলিশ সুপার মিজানুর রহমানসহ সমাজের নানাপেশার বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। নামাজ শেষে জনপ্রতিনিধিরা এত প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও মাঠে এসে নামাজ সম্পন্ন করার জন্য মুসল্লিদের আন্তরিক ধন্যবাদ ও মোবারকবাদ জানান।

​এত বড় জনসমাগমকে কেন্দ্র করে যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে গড়ে তোলা হয়েছিল এক অভেদ্য ও নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার দুর্গ। ঈদগাহ ময়দানে প্রবেশের প্রতিটি পকেট গেটে বসানো হয়েছিল আধুনিক মেটাল ডিটেক্টর, যেখানে প্রত্যেক মুসল্লিকে কঠোর দেহ তল্লাশির পর ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়। আধুনিক প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহারে পুরো মাঠ ও এর চারপাশ ঢেকে দেওয়া হয়েছিল নিরাপত্তার চাদরে; নজরদারির জন্য নিয়োজিত ছিল ৬৪টি ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা, আকাশে উড়ছিল ৭টি ড্রোন এবং সার্বক্ষণিক লাইভ স্ট্রিমিংয়ের জন্য কাজ করেছে আরও ৭টি বিশেষ ক্যামেরা। মাঠের চার কোণায় স্থাপিত ৪টি উঁচু ওয়াচ টাওয়ার থেকে দূরবীন দিয়ে দূরবর্তী গতিবিধির ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখা হচ্ছিল। পাশাপাশি যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় সদা প্রস্তুত ছিল র‌্যাবের চৌকস স্নাইপার টিম এবং বোম ডিসপোজাল ইউনিট। সব মিলিয়ে, প্রকৃতির বৈরিতা আর কঠোর নিরাপত্তার ঘেরাটোপের মাঝেও শোলাকিয়া মাঠ আরও একবার সাক্ষী হলো এক শান্তিপূর্ণ ও অনন্য ভ্রাতৃত্বের মহাসম্মিলনের।