নাড়ির টানে জনস্রোত: তীব্র গরম উপেক্ষা করেই রাজধানী ছাড়ছে লাখো মানুষ
অনলাইন ডেস্ক:
পবিত্র ঈদুল আজহার টানা সাত দিনের ছুটি শুরু হতেই রাজধানী ঢাকা রূপ নিয়েছে এক চেনা, চিরন্তন জনস্রোতের মহানগরে। স্বজনদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নেওয়ার আকুলতায় শেষ কর্মদিবসের পর থেকেই ঘরমুখো মানুষের ঢল নেমেছে বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন আর লঞ্চঘাটগুলোতে। গতকাল রবিবার বিকেল গড়াতেই ঢাকার প্রতিটি বহির্গমন পথ যেন রূপ নেয় মানবসমুদ্রে। পিঠে ব্যাগ, হাতে মালপত্র আর চোখে গ্রামে ফেরার আনন্দ নিয়ে সব বয়সী মানুষকে ছুটতে দেখা গেছে তাদের প্রিয় গন্তব্যের পানে। আগামী বৃহস্পতিবার সারা দেশে পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপিত হবে, আর এই উৎসবকে কেন্দ্র করে সরকার এবার ২৫ মে থেকে ৩১ মে পর্যন্ত টানা সাত দিনের ছুটি ঘোষণা করায় মানুষের বাড়ি ফেরার তাড়া যেন আরও কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। পূর্বনির্ধারিত সূচিতে কিছুটা পরিবর্তন এনে মন্ত্রিসভার বিশেষ সিদ্ধান্তে ঈদের ছুটি দীর্ঘ করায় এবার চাকরিজীবীরা কিছুটা বাড়তি সময় পাচ্ছেন প্রিয়জনদের সাথে কাটানোর জন্য। যদিও এই লম্বা ছুটির সমন্বয় করতে এর আগের শনিবার ও রবিবার সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কঠোর নিয়মে অফিস করতে হয়েছে, তবে বাড়ি ফেরার আনন্দের কাছে সেই বাড়তি খাটুনির ক্লান্তি নিমেষেই ফিকে হয়ে গেছে।
ঈদের আগে শেষ কর্মদিবস হওয়ায় গতকাল দুপুরের পর থেকেই দেশের প্রধান প্রশাসনিক কেন্দ্র সচিবালয় ফাঁকা হতে শুরু করে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনেকেই দুপুরের পর দাপ্তরিক কাজ সেরে সহকর্মীদের সঙ্গে কোলাকুলি ও ঈদের অগ্রিম শুভেচ্ছা বিনিময় করে মেতে ওঠেন ঢাকা ছাড়ার তাড়ায়। সচিবালয়ের গাড়ি পার্কিংয়ের বিশাল চত্বরগুলো অন্য দিনের তুলনায় অনেকটাই সুনসান দেখায়। এদিকে সাধারণ মানুষের বাড়ি ফেরার এই মহোৎসবের চাপ সরাসরি গিয়ে পড়ে দেশের আর্থিক খাতে। মাসের শেষ এবং ঈদের কেনাকাটার কারণে গতকাল ব্যাংকগুলোতে ছিল গ্রাহকদের উপচেপড়া ভিড়। শেষ মুহূর্তে প্রয়োজনীয় নগদ টাকা তুলতে এবং উৎসবের আমেজে প্রিয়জনদের সালামি দেওয়ার জন্য নতুন টাকা সংগ্রহ করতে ব্যাংকগুলোর কাউন্টারে তিল ধারণের জায়গা ছিল না। ব্যাংকিং সময়সীমা পার হওয়ার পরও অনেক এটিএম বুথের সামনে দীর্ঘ লাইন দেখা যায়, যেখানে তীব্র গরমের মধ্যেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করেছেন সাধারণ মানুষ। মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর অনেকেই বেতন-বোনাসের টাকা হাতে পেয়েই সরাসরি টার্মিনালের উদ্দেশ্যে রওনা হন।
নদীমাতৃক বাংলাদেশের ঈদযাত্রায় সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল সবসময়ই এক বিশেষ আকর্ষণ ও আবেগের জায়গা। গতকাল সকাল থেকেই দক্ষিণবঙ্গগামী মানুষের ভিড়ে মুখরিত ছিল পুরো সদরঘাট এলাকা। সদরঘাটের পন্টুনগুলোতে যেন পা ফেলার জায়গা ছিল না। তবে এবারের ঈদযাত্রায় যাত্রীদের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো। পকেটমার, অজ্ঞানপার্টি ও অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই রুখতে পুলিশের পাশাপাশি নৌ-পুলিশ এবং কোস্টগার্ডের বিশেষ দল দিনরাত টহল দিচ্ছে। প্রবেশদ্বারগুলোতে সন্দেহভাজন ব্যক্তি ও তাদের মালামাল মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে তল্লাশি করা হচ্ছে। নৌপরিবহন সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা গেছে, এবারের ঈদে নদীপথে প্রায় ১০ থেকে ১২ লাখ যাত্রী যাতায়াত করতে পারেন, যা সামাল দিতে ঢাকা নদীবন্দর থেকে বিভিন্ন রুটে প্রায় পৌনে দুইশত বিশেষ ও নিয়মিত লঞ্চ প্রস্তুত রাখা হয়েছে। নিয়মিত সময়সূচির বাইরেও যাত্রী সাধারণের অতিরিক্ত চাপের কথা মাথায় রেখে বিশেষ ট্রিপ বা ডাবল ডেকার লঞ্চের সংখ্যা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে ঘাট কর্তৃপক্ষ।
অন্যদিকে, সড়কপথের অন্যতম ব্যস্ত কেন্দ্র মহাখালী আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালে তপ্ত দুপুরের রোদে তৈরি হয় এক চরম অস্বস্তিকর পরিবেশ। গ্রীষ্মের তীব্র দাবদাহ এবং ভ্যাপসা গরমে কাউন্টারগুলোর সামনে টিকিটের জন্য অপেক্ষমাণ যাত্রীদের হাঁসফাঁস করতে দেখা যায়। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার কারণে অনেক নারী ও শিশু অসুস্থ বোধ করলেও বাড়ি ফেরার অদম্য ইচ্ছার কাছে সেই কষ্টকে তারা সয়ে নিচ্ছেন। মহাখালী থেকে সাধারণত ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, জামালপুর, নেত্রকোনা ও সিলেটের বিভিন্ন রুটে বাস চলাচল করে। এই রুটগুলোর বিশেষত্ব হলো, যাত্রীদের আগে থেকে অগ্রিম টিকিট কাটতে হয় না, ফলে তাৎক্ষণিকভাবে কাউন্টারে গিয়ে টিকিট কেনার জন্য মানুষের হুড়োহুড়ি ও বিশৃঙ্খলা অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি লক্ষ্য করা গেছে। দূরপাল্লার বাসগুলোর চালক ও সহকারীদের হাঁকডাকে পুরো টার্মিনাল জুড়েই তৈরি হয়েছে এক উৎসবমুখর অথচ ক্লান্তিকর পরিবেশ। রাস্তায় কিছু কিছু জায়গায় ধীরগতির কারণে যাত্রীদের কিছুটা দুর্ভোগ পোহাতে হলেও চালকেরা আশা করছেন, হাইওয়ে পুলিশের কঠোর নজরদারির কারণে এবার মহাসড়কগুলোতে দীর্ঘ যানজটের ভোগান্তি অনেকটাই কম হবে।
লাখো মানুষ যখন উৎসবের আমেজে শহর ছাড়ছেন, তখন দেশের সার্বিক স্বাভাবিক জীবনযাত্রা সচল রাখতে এক বিশাল জনগোষ্ঠীকে নিয়োজিত থাকতে হচ্ছে কর্মস্থলে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিশেষ প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, এই দীর্ঘ ছুটির মধ্যেও জরুরি নাগরিক সেবাগুলো সম্পূর্ণ সচল থাকবে। বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস, ফায়ার সার্ভিস, সমুদ্র ও স্থল বন্দরসমূহের সার্বিক কার্যক্রম, পরিচ্ছন্নতা কর্মী, টেলিফোন, ডাক ও ইন্টারনেট সেবার মতো অতি প্রয়োজনীয় খাতগুলো ছুটির আওতামুক্ত রাখা হয়েছে। এর ফলে উৎসবের দিনগুলোতেও নাগরিক সাধারণ যেন কোনো ধরনের ভোগান্তির শিকার না হন, তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। বিশেষ করে দেশের সকল সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ও জরুরি চিকিৎসাসেবার সাথে যুক্ত চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা নিরবচ্ছিন্নভাবে দায়িত্ব পালন করবেন এবং জীবন রক্ষাকারী ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম বহনকারী যানবাহনগুলো যেকোনো বাধা ছাড়াই দেশজুড়ে চলাচল করতে পারবে। কর্মব্যস্ত রাজধানী ঢাকা যখন ধীরে ধীরে জনশূন্য ও শান্ত হয়ে উঠছে, তখন গ্রামীণ জনপদগুলো মেতে উঠছে উৎসবের নতুন আলোয়, আর এই দুইয়ের মাঝে সংযোগ সেতু হিসেবে কাজ করছে মানুষের অবিরাম এই নাড়ির টান।