সংবাদ শিরোনাম

সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্তি: ‘সিরিয়াস আদালত অবমাননা’র অভিযোগ, আইনি লড়াইয়ের ঘোষণা

 প্রকাশ: ২০ মে ২০২৬, ০১:০৫ অপরাহ্ন   |   জাতীয়

সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্তি: ‘সিরিয়াস আদালত অবমাননা’র অভিযোগ, আইনি লড়াইয়ের ঘোষণা

​বিশেষ প্রতিবেদক | ঢাকা

​দেশের সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশে গঠিত সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্ত করে কর্মকর্তাদের আইন মন্ত্রণালয়ে ফিরিয়ে নেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্ত নিয়ে চরম উত্তেজনা ও আইনি খামখেয়ালিপনার বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সরকারের এই পদক্ষেপকে ‘সিরিয়াস আদালত অবমাননা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ শিশির মনির। আজ বুধবার (২০ মে) সুপ্রিম কোর্টের এনেক্স ভবনের সামনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এই কড়া প্রতিক্রিয়া জানান এবং আগামীকালই সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ আদালতে অবমাননার আবেদন করার সুনির্দিষ্ট ঘোষণা দেন। এর ফলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং নির্বাহী বিভাগের একচ্ছত্র সিদ্ধান্তের টানাপোড়েন আবার নতুন করে আইনি লড়াইয়ের দিকে মোড় নিল।

​হঠাৎ করেই গতকাল মঙ্গলবার (১৯ মে) আইন মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগ থেকে জারিকৃত এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে নবগঠিত সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্ত করা হয়। রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে জারি করা ওই প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শক্রমেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিসের সিনিয়র সচিবসহ ১৫ জন কর্মকর্তাকে পরবর্তী উপযুক্ত পদে পদায়নের লক্ষ্যে পুনরাদেশ না দেওয়া পর্যন্ত আইন ও বিচার বিভাগে সংযুক্ত করা হলো। প্রজ্ঞাপনে ছক আকারে কর্মকর্তাদের নাম, বিলুপ্ত সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের সাবেক পদ এবং বর্তমান সংযুক্ত পদের বিবরণ স্পষ্ট করা হয়। সরকারের এই তড়িঘড়ি সিদ্ধান্তকে বিচার বিভাগের ওপর এক ধরনের প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছেন আইনজীবী ও আইন বিশেষজ্ঞরা।

​আইনজীবী মুহাম্মদ শিশির মনিরের মতে, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় কোনো সাধারণ প্রশাসনিক শাখা ছিল না, বরং সর্বোচ্চ আদালতের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনার আলোকেই এটি গঠিত হয়েছিল। তাছাড়া, বিষয়টি এখনো উচ্চ আদালতে বিচারাধীন এবং চূড়ান্ত কোনো আইনি ফয়সালা আসার আগেই সরকার এমন নাটকীয় সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। বিচারাধীন একটি বিষয়ে নির্বাহী বিভাগের এই ধরনের হস্তক্ষেপকে তিনি চরম ধৃষ্টতা এবং দেশের বিচার ব্যবস্থার প্রতি এক প্রকার অবজ্ঞা বলে মনে করেন। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, কোনো প্রকার আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকে এভাবে গুঁড়িয়ে দেওয়া দেশের আইনের শাসনের পরিপন্থী, যার প্রতিকার চেয়ে তারা আগামীকালই আদালতের দ্বারস্থ হচ্ছেন।

​অথচ মাত্র কয়েক মাস আগে, ২০১৫ সালের ১১ ডিসেম্বর অত্যন্ত জমকালো আয়োজনের মধ্য দিয়ে সুপ্রিম কোর্টের প্রশাসনিক ভবন-৪ এ এই বহুল প্রতীক্ষিত সচিবালয়ের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছিলেন তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ। বিচার বিভাগের প্রশাসনিক কার্যক্রমে গতিশীলতা ও পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন আনার লক্ষ্যে দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এই ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। সেই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলও উপস্থিত থেকে এই উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন এবং এটিকে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার এক নতুন মাইলফলক হিসেবে অভিহিত করেছিলেন।

​কিন্তু মাত্র পাঁচ মাসের মাথায় এসে সেই সিদ্ধান্তের আমূল পরিবর্তন দেশের বিচার বিভাগ ও রাজনৈতিক মহলে তীব্র কৌতুহলের জন্ম দিয়েছে। একদিকে প্রজ্ঞাপনে বলা হচ্ছে সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে আলোচনা করেই কর্মকর্তাদের ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে আইনজীবীরা এটিকে আদালতের রায়ের লঙ্ঘন ও চরম অবমাননা হিসেবে চ্যালেঞ্জ করছেন। আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে সরকারের তথাকথিত এই ‘পরামর্শ’ আইনি কাঠামোর ভেতরে কতটা সুসংগত ছিল তা এখন খতিয়ে দেখার বিষয়। আগামীকাল আদালতে অবমাননার আবেদনটি দায়ের করা হলে বিচার বিভাগের প্রশাসনিক স্বাধীনতা রক্ষা ও নির্বাহী বিভাগের এখতিয়ারের সীমা নির্ধারণে দেশের সর্বোচ্চ আদালত কী ধরনের দিকনির্দেশনা দেয়, এখন পুরো দেশ সেদিকেই তাকিয়ে আছে।