একই আকাশে রোদ-বৃষ্টির খেলা: মৃদু তাপপ্রবাহের মাঝেই ধেয়ে আসছে বজ্রঝড়
অনলাইন ডেস্ক :
এক অদ্ভুত ও বৈচিত্র্যময় আবহাওয়ার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ। একদিকে তপ্ত রোদের তীব্রতা, আর অন্যদিকে মেঘের গর্জন ও ঝুম বৃষ্টির পূর্বাভাস—একই সময়ে দেশের আকাশে দেখা যাচ্ছে প্রকৃতির দুই বিপরীত রূপ। বসন্তের বিদায় আর গ্রীষ্মের আবাহনের এই সন্ধিক্ষণে দেশের চার জেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে মৃদু তাপপ্রবাহ, অথচ একই সময়ে দেশের অন্য প্রান্তে মেঘের ঘনঘটা আর ভারী বর্ষণের আভাস দিচ্ছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। প্রকৃতি যেন এক অদ্ভুত খেয়ালে মেতে উঠেছে, যেখানে এক জেলা পুড়ছে রোদে, আর পাশের জেলাই ভিজছে শ্রাবণের ধারায়।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় আবহাওয়া অধিদপ্তরের নিয়মিত বুলেটিনে আবহাওয়াবিদ মো. শাহীনুল ইসলাম জানান, দেশের আবহাওয়া এখন এক মিশ্র প্রবণতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। লঘুচাপের একটি বর্ধিতাংশ পশ্চিমবঙ্গ থেকে শুরু করে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল হয়ে উত্তর বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। এই সিনপটিক অবস্থার কারণেই বায়ুমণ্ডলে আর্দ্রতা ও তাপের এক জটিল সমীকরণ তৈরি হয়েছে। এর ফলে দেশের নোয়াখালী, খুলনা, বাগেরহাট ও যশোর অঞ্চলের বাসিন্দাদের অস্বস্তিকর গরম সহ্য করতে হচ্ছে, যেখানে পারদ ছাড়িয়েছে ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের গণ্ডি। গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে দক্ষিণ-পশ্চিমের জেলা যশোরে, যা ছিল ৩৬ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এই মৃদু তাপপ্রবাহ আরও কিছুকাল স্থায়ী হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
তবে এই তপ্ত পরিস্থিতির ঠিক উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে দেশের উত্তর ও পূর্বাঞ্চলে। আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায় এবং রংপুর, রাজশাহী, ঢাকা, খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের কিছু কিছু এলাকায় অস্থায়ীভাবে দমকা অথবা ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। সেই সঙ্গে বজ্রপাতসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টিপাত জনজীবনে কিছুটা স্বস্তি এনে দিতে পারে। বিশেষ করে ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের নদী অববাহিকা এবং পাহাড়ি অঞ্চলগুলোতে মাঝারি ধরনের ভারী থেকে শুরু করে অতি ভারী বর্ষণের প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে পাহাড়ি জেলা রাঙামাটিতে, যার পরিমাণ ছিল ৮৬ মিলিমিটার। বৃষ্টি এবং মেঘের এই উপস্থিতির কারণে দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে সিলেটে, ২১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
এই রোদ-বৃষ্টির মেলবন্ধন কেবল এক দিনের নয়, বরং আগামী দিনগুলোতেও এই ধারা অব্যাহত থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বুধবার সন্ধ্যা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার যে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, তাতে দেখা যাচ্ছে বৃষ্টির পরিধি আরও কিছুটা বাড়তে পারে। ময়মনসিংহ, ঢাকা ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায় এবং রংপুর, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিভাগের কিছু কিছু এলাকায় বৃষ্টির তীব্রতা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এমনকি দক্ষিণের খুলনা ও বরিশাল বিভাগের দু-এক জায়গায় বিচ্ছিন্নভাবে বৃষ্টি হতে পারে। এই বৃষ্টির প্রভাবে দেশের দিনের তাপমাত্রা সামান্য হ্রাস পেতে পারে, যা ভ্যাপসা গরম থেকে সাধারণ মানুষকে কিছুটা হলেও রেহাই দেবে। তবে রাতের তাপমাত্রায় বড় কোনো পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই, ফলে রাতের দিকে ভ্যাপসা গরমের অনুভূতি বজায় থাকতে পারে।
প্রকৃতির এই আকস্মিক পরিবর্তনের কারণে একদিকে যেমন তাপপ্রবাহে জনজীবন ও কৃষিকাজে কিছুটা ক্লান্তি নেমে এসেছে, অন্যদিকে হঠাৎ ধেয়ে আসা বজ্রঝড় ও দমকা হাওয়া কালবৈশাখীর আগমনী বার্তা দিচ্ছে। আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা এই সময়ে বজ্রপাতের সময় সবাইকে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার এবং তীব্র রোদে চলাচলের সময় সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। সব মিলিয়ে, দেশের আকাশে এখন রোদ আর বৃষ্টির এক অভূতপূর্ব সহাবস্থান চলছে, যা আধুনিক জলবায়ু পরিবর্তনের এক চাক্ষুষ উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।