বাতিল হলো সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ১৫ কর্মকর্তা মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত
প্রতিবেদক ঢাকা :
বাংলাদেশের বিচার বিভাগের প্রশাসনিক সংস্কারের ইতিহাসে এক নাটকীয় মোড় পার হলো। প্রতিষ্ঠার মাত্র কয়েক মাসের মাথায় বন্ধ হয়ে গেল বহুল আলোচিত স্বাধীন সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের পথচলা। সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে সরাসরি পরামর্শের ভিত্তিতে সরকার এই সচিবালয়টি বিলুপ্ত ঘোষণা করেছে। একই সাথে সচিবালয়ের সিনিয়র সচিবসহ জুডিসিয়াল সার্ভিসের ১৫ জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। মঙ্গলবার (১৯ মে) রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে আইন ও বিচার বিভাগ থেকে এই সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এর মাধ্যমে দেশের বিচার বিভাগের সম্পূর্ণ পৃথকীকরণের যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল, তা নতুন এক প্রশাসনিক মারপ্যাঁচে আটকা পড়ল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রকাশিত প্রজ্ঞাপনে ছক আকারে কর্মকর্তাদের নাম, বিলুপ্ত সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের তাদের সাবেক পদ এবং আইন মন্ত্রণালয়ে বর্তমান সংযুক্ত পদের বিবরণ স্পষ্ট করা হয়েছে। তবে এই প্রজ্ঞাপনের সবচেয়ে কৌতূহল উদ্দীপক দিক হলো এর সময়কাল। মে মাসের ১৯ তারিখে এই আদেশ জারি করা হলেও, এর ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতা দেখানো হয়েছে গত ১০ এপ্রিল থেকে। একই দিনে জারি করা পৃথক একটি অফিস আদেশে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিসের এই কর্মকর্তাদের দাখিল করা যোগদানপত্র ১০ এপ্রিল থেকেই ভূতাপেক্ষভাবে গ্রহণ করা হলো। মূলত এর আগের দিন, অর্থাৎ ৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশটি আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করা হয়েছিল। আইনি ও প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতেই এই ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতার কৌশল নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
এই পুরো ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল গত বছরের শেষের দিকে। বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও প্রভাবমুক্ত রাখার লক্ষে দীর্ঘদিনের দাবির মুখে ২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ অত্যন্ত জমকালো আয়োজনের মধ্য দিয়ে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের উদ্বোধন করেছিলেন। সে সময় বিষয়টিকে বিচার বিভাগের ইতিহাসে একটি মাইলফলক এবং ঐতিহাসিক বিজয় হিসেবে দেখা হয়েছিল। কিন্তু নতুন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতায় মাত্র চার মাসের মাথায় গত ৯ এপ্রিল সংসদে সেই অধ্যাদেশ বাতিল হয়ে যায়, যার চূড়ান্ত প্রশাসনিক রূপ প্রকাশ পেল এই প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে।
সচিবালয় বিলুপ্তির এই সিদ্ধান্ত দেশের আইন অঙ্গনে এবং সাধারণ মানুষের মনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। আইনি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পৃথক সচিবালয় সুপ্রিম কোর্টের নিজস্ব প্রশাসনিক সক্ষমতা ও স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করার জন্য অত্যন্ত জরুরি ছিল। এখন পুনরায় কর্মকর্তাদের আইন মন্ত্রণালয়ে ফিরিয়ে নেওয়ার ফলে বিচার বিভাগের ওপর নির্বাহী বিভাগের পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ আবার জোরালো হতে পারে। তবে সরকারের একটি পক্ষের দাবি, প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা দূর করা এবং রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ওপর অতিরিক্ত চাপ কমাতেই সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে এই যৌক্তিকীকরণ করা হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সুরক্ষায় সুপ্রিম কোর্ট আগামী দিনগুলোতে কী ধরনের অবস্থান নেয়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।