জট খুলছে জ্বালানি পরিবহনের: জুনের শেষেই চালু হচ্ছে চট্টগ্রাম-ঢাকা তেল পাইপলাইন
অনলাইন ডেস্ক :
দেশের জ্বালানি খাতের ইতিহাসে এক নতুন দিগন্তের সূচনা হতে যাচ্ছে আগামী জুন মাসের শেষভাগে। দীর্ঘ প্রতীক্ষিত চট্টগ্রাম-ঢাকা তেল পাইপলাইনের নির্মাণকাজ সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে, যার মাধ্যমে দেশের জ্বালানি তেল পরিবহনে এক যুগান্তকারী ও আধুনিক অধ্যায়ের সূচনা ঘটবে। এখন শুধু শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিটুকুই বাকি। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী মাসের শেষ দিনগুলোতেই এই পাইপলাইনের মাধ্যমে পুরোদমে তেল সরবরাহ শুরু হবে। এর ফলে দেশের প্রধান বন্দরনগরী থেকে রাজধানীতে জ্বালানি তেল পরিবহনের সনাতন, ধীরগতির এবং ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবস্থার অবসান ঘটতে যাচ্ছে।
জ্বালানি খাতের এই মেগা প্রকল্পের মহাসফলতার খবরটি আনুষ্ঠানিকভাবে সামনে আসে মঙ্গলবার (১৯ মে)। এদিন জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটির দ্বিতীয় বৈঠকে এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করা হয়। দেশের বর্তমান জ্বালানি পরিস্থিতি পর্যালোচনা এবং উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় করণীয় সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট সুপারিশসহ সংসদে রিপোর্ট প্রদানের লক্ষ্যে এই বিশেষ কমিটির আয়োজন করা হয়েছিল। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন কমিটির সভাপতি এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। আধুনিক সাংবাদিকতার মানদণ্ডে এই প্রকল্পকে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য একটি 'গেম চেঞ্জার' বা যুগান্তকারী মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বৈঠকে দেশের সার্বিক জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে যেমন বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে, তেমনি ভবিষ্যতের রূপরেখাও তুলে ধরা হয়েছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, হুইপ এবিএম আশরাফ উদ্দিন (নিজান), হুইপ মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপুসহ কমিটির অন্যান্য প্রভাবশালী সদস্য যথাক্রমে মঈনুল ইসলাম খান, মো. সাইফুল আলম, মো. নূরুল ইসলাম, মো. আব্দুল বাতেন, মো. আবুল হাসনাত ও মোহাম্মদ আবুল হাসান এই নীতি-নির্ধারণী সভায় সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে একটি তথ্যবহুল প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে দেশে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে নেওয়া বিভিন্ন মেগা প্রকল্প, নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে গৃহীত আধুনিক নীতিমালা এবং বর্তমান বাস্তব চিত্র কমিটির সামনে অত্যন্ত চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়।
দীর্ঘদিন ধরে দেশের জ্বালানি তেল পরিবহনের ক্ষেত্রে নৌপথ এবং সড়কপথের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করতে হতো। এতে একদিকে যেমন সময় ও অর্থ দুটোই বেশি অপচয় হতো, অন্যদিকে আবহাওয়া ও নানা প্রতিকূলতার কারণে প্রায়শই সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা থাকত। চট্টগ্রাম-ঢাকা পাইপলাইন চালুর মাধ্যমে এই পুরো প্রক্রিয়াই এখন সম্পূর্ণ সুরক্ষিত, সাশ্রয়ী এবং দ্রুতগতির হয়ে উঠবে। যা দেশের শিল্প উৎপাদন এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
একই বৈঠকে দেশের জ্বালানি খাতের আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের এক বিশাল চিত্রও উঠে আসে। কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, যুগের চাহিদার সাথে তাল মিলিয়ে ফিলিং স্টেশন স্থাপন, পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা নীতিমালাকে আধুনিক ও যুগোপযোগী করার কাজ বর্তমানে দ্রুত গতিতে চলছে। এরই ধারাবাহিকতায়, পুরনো 'গ্যাস বিপণন নিয়মাবলী ২০১৪' কে পুরোপুরি হালনাগাদ করে সময়োপযোগী 'গ্যাস বিপণন নিয়মাবলী ২০২৬' প্রণয়ন করা হয়েছে, যা এই খাতের সুশাসন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে বড় ভূমিকা রাখবে।
বৈঠকের শেষ অংশে দেশের চলমান জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে বিরোধী দলের গঠনমূলক ভূমিকার ওপর জোর দেওয়া হয়। উদ্ভূত যেকোনো পরিস্থিতি সম্মিলিতভাবে মোকাবিলা করার লক্ষ্যে বিরোধী দলের সদস্যদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় ও মূল্যবান পরামর্শ লিখিত আকারে কমিটির কাছে পাঠানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। সরকারি ও বিরোধী পক্ষের এই সম্মিলিত প্রয়াসের ওপর ভিত্তি করে কমিটি খুব শীঘ্রই প্রয়োজনীয় সুপারিশসহ জাতীয় সংসদে একটি পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট পেশ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব এবং বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সচিবসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকটি দেশের টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তার ইতিহাসে একটি মাইলফলক হিসেবেই গণ্য হচ্ছে।