৪০ ভাগই অজানায়: জন্মের পর থাইরয়েড পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করার দাবি বিশেষজ্ঞদের

 প্রকাশ: ১৯ মে ২০২৬, ১০:২৬ অপরাহ্ন   |   জাতীয়

৪০ ভাগই অজানায়: জন্মের পর থাইরয়েড পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করার দাবি বিশেষজ্ঞদের

অনলাইন ডেস্ক :

​বাংলাদেশে প্রতিনিয়ত নীরব এক ব্যাধি হিসেবে জাঁকিয়ে বসছে থাইরয়েডের সমস্যা। দেশের প্রায় ২০ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে এই জটিলতায় ভুগছেন, যার একটি বড় অংশই নারী। অথচ আক্রান্তদের প্রায় ৬০ ভাগ রোগীই রয়ে গেছেন আধুনিক চিকিৎসা সেবার বাইরে। মূলত সঠিক সময়ে রোগ শনাক্ত না হওয়া এবং সচেতনতার চরম অভাবের কারণেই এই স্বাস্থ্যঝুঁকি প্রকট আকার ধারণ করছে। এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে আগামী প্রজন্মকে রক্ষা করতে এবং দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা এড়াতে এখন প্রতিটি শিশুর জন্মের পর পরই থাইরয়েড পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করার দাবি তুলেছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় হরমোন ও পরমাণু চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা।

​মঙ্গলবার (১৯ মে) বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) নিনমাস কনফারেন্স রুমে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের গোলটেবিল বৈঠকে এই জোরালো দাবি জানানো হয়। আগামী ২৫ মে বিশ্ব থাইরয়েড দিবস এবং ‘আন্তর্জাতিক থাইরয়েড সচেতনতা সপ্তাহ’ উপলক্ষে যৌথভাবে এই বৈঠকের আয়োজন করে বাংলাদেশ থাইরয়েড সোসাইটি (বিটিএস) ও বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরাম (বিএইচআরএফ)। এবারের থাইরয়েড দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে— ‘জানুন, পরীক্ষা করুন, জয় করুন’ এবং ‘আপনার থাইরয়েড, আপনার রক্ষক’। অনুষ্ঠানে বিশেষজ্ঞরা দেশের এই বিশাল জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য সংকট নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

​বৈঠকের মূল আলোচনায় বক্তারা দেশের বর্তমান থাইরয়েড পরিস্থিতির একটি উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেন। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আক্রান্তদের মধ্যে প্রতি সাতজনের মধ্যে পাঁচজনই নারী। একই সঙ্গে প্রতি ২ হাজার ৩০০ শিশুর মধ্যে একজন জন্মগতভাবে থাইরয়েডের নানা সমস্যা নিয়ে পৃথিবীতে আসছে। থাইরয়েড রোগীদের একটি বড় অংশ, প্রায় ৬ শতাংশ, হাইপোথাইরয়েডিজমে ভুগছেন। এই রোগীরা চরম ক্লান্তি, অস্বাভাবিক ওজন বৃদ্ধি, কোষ্ঠকাঠিন্য এবং প্রচণ্ড ঠান্ডা লাগার মতো সমস্যায় ভোগেন, অথচ অধিকাংশ সময়ই তারা নিজেরাও বুঝতে পারেন না যে এর পেছনে লুকিয়ে আছে থাইরয়েডের গোলযোগ। চিকিৎসকেরা স্পষ্ট জানিয়েছেন, রোগের একদম শুরুর দিকে যদি সঠিক রোগ নির্ণয় করা যায়, তবে এই ব্যাধির সফল চিকিৎসা এবং একে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

​গোলটেবিল বৈঠকের প্রধান আলোচক এবং ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার মেডিসিন অ্যান্ড অ্যালায়েড সায়েন্সেসের (নিনমাস) পরিচালক অধ্যাপক ডা. এ কে এম ফজলুল বারী থাইরয়েড গ্রন্থির গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, এটি মানবদেহের হরমোন নিঃসরণের একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও অপরিহার্য অঙ্গ। শরীরের সামগ্রিক বিপাক হার, হৃদস্পন্দন, রক্তচাপ, ওজন এবং তাপমাত্রা স্বাভাবিক রাখার পেছনে এই গ্রন্থির ভূমিকা অনস্বীকার্য। এই ছোট্ট গ্রন্থিটিতে কোনো ধরনের হরমোনজনিত ভারসাম্যহীনতা দেখা দিলে তা পুরো শরীরের কার্যক্ষমতা ওলটপালট করে দিতে পারে, যার চূড়ান্ত পরিণতি হতে পারে হাইপোথাইরয়েডিজম কিংবা থাইরয়েড ক্যানসারের মতো মারাত্মক ব্যাধি। তিনি আফসোস করে বলেন যে, বাংলাদেশে সরকারি অর্থায়নে থাইরয়েড চিকিৎসায় সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ নেই বললেই চলে। নিজস্ব কোনো বড় ধরনের জাতীয় ডাটাবেজ বা কর্মসূচি না থাকায়, দেশের প্রকৃত রোগীর সংখ্যা আড়ালেই থেকে যাচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যানের ওপর নির্ভর করে আমাদের হিসাব কষতে হচ্ছে।

​এই জনস্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলায় অধ্যাপক ডা. ফজলুল বারী মানুষের পুরো জীবনচক্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চারটি সময়ে থাইরয়েড স্ক্রিনিং বা হরমোন পরীক্ষা করার ওপর বিশেষ জোর দেন। তার মতে, শিশুর জন্মের পর পরই স্ক্রিনিং করা রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত। এর পাশাপাশি বয়ঃসন্ধিকালে, নারীদের গর্ভধারণের পূর্বে এবং বয়স ৫০ বছর পার হওয়ার পর পরই প্রত্যেকের থাইরয়েড পরীক্ষা করা জরুরি।

​বৈঠকে আলোচনার সূত্র ধরে বাংলাদেশ থাইরয়েড সোসাইটির সহসভাপতি ডা. শাহজাদা সেলিম বিশ্ব পরিস্থিতির সঙ্গে দেশের অবস্থার তুলনা করে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৫৮৯ মিলিয়ন মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত এবং থাইরয়েডের রোগীর সংখ্যাও এর কাছাকাছি। কিন্তু ডায়াবেটিস নিয়ে যতটা মাতামাতি ও গবেষণা হয়, থাইরয়েড নিয়ে তেমনটি দেখা যায় না। বাংলাদেশে সুনির্দিষ্ট গবেষণা না থাকলেও ধারণা করা হচ্ছে প্রায় ৩ থেকে ৪ কোটি মানুষ এই হরমোনজনিত সমস্যায় ভুগছেন। এমনকি বিএমইউ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা মায়েদের অন্তত ৮ শতাংশ হাইপোথাইরয়েডের রোগী, যা গর্ভস্থ শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশ ও বুদ্ধিমত্তা মারাত্মকভাবে কমিয়ে দেয়।

​এদিকে দেশের প্রান্তিক পর্যায়ে সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের ভূমিকার বিষয়টি তুলে ধরেন বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের সেক্রেটারি মুজাহিদ শুভ। তিনি বলেন, ঢাকার বাইরের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের গণমাধ্যমকর্মীরা এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের অভাবে সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে পারছেন না। ফলে গ্রামীণ বা প্রান্তিক অঞ্চলের অর্ধেক মানুষই থাইরয়েড সম্পর্কে কোনো প্রাথমিক ধারণাও রাখেন না। তাই এই জাতীয় সচেতনতা কার্যক্রমকে কেবল ঢাকা কেন্দ্রিক না রেখে জেলা পর্যায়ে ছড়িয়ে দিতে হবে।

​গোলটেবিল বৈঠক শেষে নিনমাসের অধ্যাপক ডা. কামালউদ্দিন আহমেদ অডিটোরিয়ামে একটি বিশেষ বৈজ্ঞানিক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএমইউ উপাচার্য অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন প্রো ভাইস চ্যান্সেলর (গবেষণা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. মো. মুজিবর রহমান হাওলাদার, বাংলাদেশ থাইরয়েড সোসাইটির প্রাক্তন সভাপতি অধ্যাপক ডা. ফওজিয়া মোসলেম এবং বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের প্রাক্তন চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. এম এ করিম। সেমিনারে উপস্থিত দেশের চিকিৎসা বিজ্ঞানী ও গবেষকেরা একযোগে সহমত প্রকাশ করেন যে, থাইরয়েডজনিত প্রতিবন্ধকতা দূর করতে এখন ব্যক্তি পর্যায় থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত সমন্বিত উদ্যোগ ও নীতিমালার বাস্তবায়ন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

Advertisement
Advertisement
Advertisement