পটুয়াখালীতে বিএনপি-জামায়াত দ্বন্দ্বে মাঝনদীতে অবরুদ্ধ সেতুমন্ত্রী, উত্তেজনা চরমে

 প্রকাশ: ১৯ মে ২০২৬, ১০:২২ অপরাহ্ন   |   জাতীয়

পটুয়াখালীতে বিএনপি-জামায়াত দ্বন্দ্বে মাঝনদীতে অবরুদ্ধ সেতুমন্ত্রী, উত্তেজনা চরমে

​প্রতিনিধি,পটুয়াখালী :

পটুয়াখালীর বাউফলে লোহালিয়া নদীর ওপর প্রস্তাবিত ‘বগা সেতু’ নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাই করতে গিয়ে এক নজিরবিহীন ও নাটকীয় পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। দেশের দক্ষিণ অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই মেগা প্রকল্পের মাঠ পরিদর্শনে গিয়ে রাজনৈতিক টানাপোড়েনের বেড়াজালে আটকা পড়েন তিনি। জামায়াত ও বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীদের মুখোমুখি অবস্থান, পাল্টাপাল্টি স্লোগান এবং তীব্র উত্তেজনার জেরে প্রায় এক ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর শেষ পর্যন্ত পূর্বনির্ধারিত জনসভা না করেই ঘটনাস্থল ত্যাগ করতে বাধ্য হন মন্ত্রী। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে উপজেলার বগা ফেরিঘাট এলাকায় এই ঘটনা ঘটে, যা কেন্দ্র করে স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন করে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে।

​দীর্ঘদিন ধরে উপেক্ষিত পটুয়াখালীবাসীর স্বপ্নের ‘বগা সেতু’ নির্মাণের দাবিটি নতুন গতি পায় বাউফলের দ্বিতীয় শ্রেণির এক খুদে শিক্ষার্থী আদিরা বিনতে মাহামুদের একটি আবেগঘন চিঠির মাধ্যমে। চিঠির পাশাপাশি তার একটি ভিডিওচিত্র বেসরকারি টেলিভিশনে প্রচারিত হলে তা সরাসরি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এর পরিপ্রেক্ষিতেই প্রধানমন্ত্রী সেতুমন্ত্রীকে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। প্রধানমন্ত্রীর সেই নির্দেশনা বাস্তবায়নে গতকাল দুপুর ১টার দিকে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তা ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে নিয়ে বগা ফেরিঘাটে পৌঁছান সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। লোহালিয়া নদীর পূর্বপাড়ে বগা সেতুর সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর সেখানে জামায়াতের মনোনয়নে পটুয়াখালী-২ (বাউফল) আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদের উদ্যোগে একটি সুধী সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছিল। সেতুমন্ত্রী সফরসঙ্গী হিসেবে এমপি শফিকুল ইসলাম মাসুদকে নিয়ে ফেরিতে চড়ে নদীর পূর্বপাড়ে পৌঁছানো মাত্রই বিপত্তির সূত্রপাত ঘটে।

​জামায়াতের ব্যানারে আয়োজিত এই সমাবেশকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং কর্মসূচি প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়ে ফেরিঘাট এলাকায় অবস্থান নেন। সেতুমন্ত্রীর গাড়িবহর পূর্বপাড়ে পৌঁছামাত্রই চারদিক থেকে বিএনপির শত শত নেতাকর্মী ও সমর্থক সেটিকে অবরুদ্ধ করে ফেলেন। মুহূর্তের মধ্যে পুরো ফেরিঘাট এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। জামায়াত ও বিএনপির নেতাকর্মীরা একে অপরের মুখোমুখি অবস্থান নিয়ে প্রচণ্ড উত্তেজনার সৃষ্টি করেন এবং দুই পক্ষের মধ্যে তুমুল পাল্টাপাল্টি স্লোগান চলতে থাকে। উত্তেজনাকর এই পরিস্থিতিতে ঘটনাস্থলে পটুয়াখালী-১ আসনের সংসদ সদস্য আলতাফ হোসেন চৌধুরী, জেলা বিএনপির সভাপতি স্নেহাংশু সরকার, সাধারণ সম্পাদক মুজিবুর রহমান টোটন এবং পটুয়াখালী-২ আসনে বিএনপির পরাজিত প্রার্থী শহীদুল আলম তালুকদারসহ বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন। স্থানীয়দের দাবি, জামায়াত এককভাবে এই কৃতিত্ব নেওয়ার চেষ্টা করায় ক্ষুব্ধ হয়ে এবং মন্ত্রীকে ওই সভায় অংশ নিতে না দেওয়ার উদ্দেশ্যেই পরিকল্পিতভাবে এই প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়।

​প্রায় ৪৫ মিনিট মাঝনদীতে এবং ফেরিঘাটের সংযোগস্থলে অবরুদ্ধ থাকার পর পরিস্থিতির কোনো উন্নতি না দেখে চরম বিরক্ত ও ক্ষুব্ধ হন সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে এবং অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে তিনি সমাবেশস্থলে না গিয়ে একই ফেরিতে করে নদীর পশ্চিমপাড়ে ফিরে আসেন। এই সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত সাংবাদিকরা উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে তার মন্তব্য জানতে চাইলে তিনি কোনো কথা না বলে গম্ভীর মুখে গাড়িবহরে চড়ে পটুয়াখালীর উদ্দেশে রওনা হন। ঘটনার বিষয়ে বাউফল উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব আপেল মাহমুদ ফিরোজ পরে সাংবাদিকদের জানান, সভার মূল ব্যানারে দেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর কোনো ছবি না থাকায় এবং জামায়াত এককভাবে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার চেষ্টা করায় সাধারণ নেতাকর্মী ও সমর্থকরা ক্ষুব্ধ হয়ে সেতুমন্ত্রীকে অবরুদ্ধ করেছিলেন।

​বাউফলের এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও উত্তপ্ত পরিস্থিতি এড়িয়ে সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম পরবর্তীতে দুমকি উপজেলার ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসা মাঠে বিএনপি আয়োজিত একটি জনসভায় প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেন। সেখানে দেওয়া ভাষণে তিনি বাউফলের বগা ফেরিঘাটের ঘটনার কোনো সরাসরি উল্লেখ না করলেও খুদে শিক্ষার্থী আদিরার চিঠির প্রসঙ্গ টেনে সেতুর ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দেন। সেতুমন্ত্রী জানান, দেশনেত্রীর নির্দেশে তিনি এখানে এসেছেন এবং কোনো রাজনৈতিক কোন্দল বগা সেতুর উন্নয়ন কাজকে থামিয়ে রাখতে পারবে না। তিনি আশ্বস্ত করে বলেন, কারিগরি ও ভৌগোলিক সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ দ্রুত শেষ করা হচ্ছে এবং সবকিছু অনুকূলে থাকলে চলতি ২০২৬ সালের শেষ দিকে অথবা আগামী ২০২৭ সালের শুরুতেই স্বপ্নের বগা সেতুর দৃশ্যমান নির্মাণকাজ শুরু করা সম্ভব হবে। তবে বাউফলের এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে জেলা জুড়ে রাজনৈতিক দল দুটির তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে এখনো থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

Advertisement
Advertisement
Advertisement