গুলশান-বারিধারা লেকের প্রাণ ফেরানোর মহোদ্যোগ: প্রধানমন্ত্রীর কড়া নির্দেশ, বদলে যাচ্ছে রাজধানীর রূপ
মহানগর ডেস্ক:
রাজধানীর ফুসফুস খ্যাত গুলশান, বনানী ও বারিধারা লেকের সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনতে এবং দূষণমুক্ত পরিবেশ গড়তে এক মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। মঙ্গলবার (১৯ মে) বাংলাদেশ সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এই লেকগুলোর আধুনিকায়ন ও টেকসই পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রেস উইং থেকে জানানো হয়েছে, এই বৈঠকটি ছিল মূলত রাজধানীর হৃদপিণ্ড বলে পরিচিত এই বিশাল জলাধারকে কেন্দ্র করে একটি সমন্বিত নগর উন্নয়ন মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের অংশ।
বৈঠকের শুরুতেই গুলশান-বনানী ও বারিধারা লেকের বর্তমান নাজুক চিত্র এবং ক্রমাগত দূষণের চিত্র প্রধানমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরা হয়। বিশেষ করে গৃহস্থালি ও বাণিজ্যিক বর্জ্য সরাসরি লেকের পানিতে পড়ার কারণে কীভাবে বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস হচ্ছে এবং এলাকার পরিবেশ বিপন্ন হচ্ছে, তা বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করা হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ সময় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, আধুনিক ও বাসযোগ্য ঢাকা গড়তে হলে এই জলাশয়গুলোকে শুধু টিকিয়ে রাখাই যথেষ্ট নয়, বরং এগুলোর পানির গুণগত মান আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে হবে। তিনি অনতিবিলম্বে লেকের পানি দূষণ রোধে অবৈধ সুয়ারেজ লাইন বিচ্ছিন্ন করা এবং অত্যাধুনিক শোধন প্ল্যান্ট (এসটিপি) স্থাপনের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে লেকের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা করে এর চারপাশ জুড়ে দৃষ্টিনন্দন ওয়াকওয়ে, সবুজ বেষ্টনী ও নাগরিকদের জন্য আধুনিক বিনোদন সুবিধা বাড়ানোর তাগিদ দেওয়া হয়।
এই মেগা প্রজেক্ট বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করার কড়া নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী। বৈঠকে উপস্থিত গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমন লেকের চারপাশের অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ এবং রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী দ্রুত নকশা প্রণয়নের প্রতিশ্রুতি দেন। অন্যদিকে, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানান, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ড্রেনেজ ব্যবস্থার আধুনিকায়নের মাধ্যমে লেকে ময়লা পানি ঢোকা চিরতরে বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
বৈঠকে অংশ নেওয়া ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালাম নিজ নিজ এলাকার সীমানার মধ্যে থাকা লেক অংশের নিরাপত্তা জোরদার, আধুনিক লাইটিং ব্যবস্থা এবং ভাসমান ময়লা পরিষ্কারে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এবিএম আব্দুস সাত্তার এবং রাজউক চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম এই প্রকল্পের বাজেট, সম্ভাব্যতা যাচাই এবং আন্তর্জাতিক মানের আর্কিটেকচারাল ডিজাইনের অগ্রগতি সম্পর্কে সভাকে অবহিত করেন।
দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় যে, শুধু সৌন্দর্যবর্ধনই নয়, লেকগুলোকে কেন্দ্র করে ওয়াটার ট্যাক্সি সার্ভিস এবং পরিবেশ-বান্ধব বিনোদন কেন্দ্র গড়ে তোলা হবে, যা রাজধানীর যানজট নিরসনে এবং নাগরিকদের মানসিক প্রশান্তির খোরাক জোগাতে ভূমিকা রাখবে। প্রধানমন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব আব্দুর রহমান সানিসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিব ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন এবং প্রত্যেকেই এই রূপান্তরকামী প্রকল্পটিকে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে শেষ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। ঢাকার এই ঐতিহ্যবাহী লেকগুলোর পুনরুজ্জীবন শুধু সৌন্দর্যই বাড়াবে না, বরং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় রাজধানী ঢাকাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে বলে আশা করছেন নগর পরিকল্পনাবিদেরা।