ঢাকা বার নির্বাচন: জোট ভাঙার খেসারত নাকি ভোটের সমীকরণে জামায়াত-এনসিপি’র অন্তর্ধান?

 প্রকাশ: ০৪ মে ২০২৬, ০২:০৪ অপরাহ্ন   |   জাতীয়

ঢাকা বার নির্বাচন: জোট ভাঙার খেসারত নাকি ভোটের সমীকরণে জামায়াত-এনসিপি’র অন্তর্ধান?

​নিজস্ব প্রতিবেদক | ৪ মে, ২০২৬

​দক্ষিণ এশিয়ার আইনজীবীদের অন্যতম বৃহৎ মিলনস্থল ঢাকা বার অ্যাসোসিয়েশন। আদালত পাড়ার এই ‘মিনি পার্লামেন্ট’খ্যাত সংগঠনের ২০২৬-২০২৭ সেশনের নির্বাচনে এবার বইছে ভিন্ন হাওয়া। গত ২৯ ও ৩০ এপ্রিলের দুই দিনব্যাপী লড়াই শেষে শুক্রবার রাতে যখন ফলাফল ঘোষণা করা হলো, তখন দেখা গেল একসময়ের মিত্রদের লড়াইয়ে মাঠ একচ্ছত্রভাবে দখল করে নিয়েছে বিএনপি ও গণঅধিকার পরিষদ সমর্থিত ‘নীল প্যানেল’। ২৩টি পদের সবকটিতে জয় পেয়ে তারা যখন বিজয় উল্লাসে মত্ত, তখন জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি সমর্থিত ‘সবুজ প্যানেল’র ঘরে কেবলই হারের ক্ষত আর ভরাডুবির গ্লানি।

​কিন্তু কেন এই ঐতিহাসিক বিপর্যয়? আদালত পাড়ার অলিগলি আর চায়ের কাপে এখন এই প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে। দুই দশকের পুরোনো বন্ধুত্বের দেয়াল ভেঙে এবারই প্রথম বিএনপি ও জামায়াত আলাদা প্যানেলে মুখোমুখি হয়েছিল। আর এই বিচ্ছেদই যেন জামায়াতের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘ বিশ বছর বিএনপির ছায়াতলে থেকে জামায়াত যে নির্বাচনী বৈতরণী পার হতো, একা লড়তে গিয়ে সেই ‘ভোটব্যাংকের’ দৈন্যদশা প্রকটভাবে ফুটে উঠেছে।

​নির্বাচনের নেপথ্য গল্প বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আওয়ামী লীগপন্থি আইনজীবীদের একটি বিশাল অংশ এবার ভোটদান থেকে বিরত ছিলেন। প্রায় ৬৬ শতাংশ ভোটারের অনুপস্থিতি নির্বাচনের আমেজকে কিছুটা ম্লান করলেও, যারা কেন্দ্রে এসেছিলেন তাদের বড় অংশই ঝুঁকেছেন নীল প্যানেলের দিকে। সাধারণ আইনজীবীদের ধারণা, বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে উন্নয়ন ও পেশাগত স্বার্থ রক্ষায় নীল প্যানেলই বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে।

​পরাজিত শিবিরের অভিযোগ অবশ্য গতানুগতিক। সবুজ প্যানেলের সভাপতি প্রার্থী এস এম কামাল উদ্দিনের দাবি—ভোট সুষ্ঠু হয়নি, আইডি কার্ড ছাড়াই জাল ভোট দেওয়া হয়েছে। তবে এই অভিযোগকে স্রেফ ‘রাজনৈতিক স্টান্ট’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন বিজয়ী সভাপতি খোরশেদ মিয়া আলম। তার মতে, জামায়াতের নিজস্ব ভোট বড়জোর এক হাজারের আশেপাশে, যেখানে বিএনপির ভোটব্যাংক কয়েক হাজার। আগে জোটে থাকার কারণে তারা আসন পেত, এখন সেই ভ্রান্তি ঘুচেছে।

​আরেকটি বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে প্রার্থীদের গ্রহণযোগ্যতা। আইনজীবীদের মতে, সবুজ প্যানেলের অনেক প্রার্থীই সাধারণ সদস্যদের কাছে ছিলেন অচেনা। নিয়মিত ওকালতি বা বার লাইব্রেরির আড্ডায় যাদের দেখা মেলে না, ব্যালট পেপারে তাদের প্রতি আস্থা রাখতে পারেননি ভোটাররা। অন্যদিকে, আওয়ামী লীগপন্থি হেমায়েত উদ্দিন খান হিরন মনে করেন, জামায়াতের আদর্শিক সীমাবদ্ধতা এবং শিক্ষিত আইনজীবীদের মাঝে তাদের গ্রহণযোগ্যতার অভাবই এই ভরাডুবির অন্যতম কারণ।

​সব মিলিয়ে ঢাকা বারের এবারের নির্বাচন কেবল একটি জয়-পরাজয়ের গল্প নয়, বরং এটি দেশের বর্তমান রাজনৈতিক মেরুকরণ আর জোট ভাঙা-গড়ার এক নতুন সমীকরণ। ২০ হাজার ৭৮৫ জন ভোটারের মধ্যে মাত্র ৩৪ শতাংশের রায় নিয়ে নীল প্যানেল পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করলেও, জামায়াতের এই শোচনীয় পরাজয় আগামী দিনের আইনজীবী রাজনীতিতে এক বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

Advertisement
Advertisement
Advertisement