কুকি-চিনের পোশাক জালিয়াতি: হাইকোর্টে ভুয়া আদেশে আসামির মুক্তি, বেঞ্চ কর্মকর্তা বরখাস্ত

 প্রকাশ: ০৪ মে ২০২৬, ০১:০৯ অপরাহ্ন   |   জাতীয়

কুকি-চিনের পোশাক জালিয়াতি: হাইকোর্টে ভুয়া আদেশে আসামির মুক্তি, বেঞ্চ কর্মকর্তা বরখাস্ত

​নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা সোমবার, ৪ মে, ২০২৬

​দেশের বিচারিক ইতিহাসে এক নজিরবিহীন জালিয়াতির ঘটনায় হাইকোর্টের বেঞ্চ কর্মকর্তা জাকির হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের (কেএনএফ) জন্য ২০ হাজার সামরিক পোশাক তৈরির মামলার প্রধান আসামি সাহেদুল ইসলামকে সুকৌশলে জেল থেকে বের করে আনার নেপথ্যে এই কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতা পাওয়ায় সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন আজ সোমবার এই কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।

​ঘটনার সূত্রপাত হয় গত বুধবার (২৯ এপ্রিল), যখন রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল এই ভয়াবহ জালিয়াতির বিষয়টি প্রধান বিচারপতির নজরে আনেন। প্রধান বিচারপতি ঘটনাটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন। তদন্তে বেরিয়ে আসে এক রোমহর্ষক জালিয়াতির চিত্র।

​তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বর্ণনা অনুযায়ী, চট্টগ্রামের ‘রিংভো অ্যাপারেলস’-এর মালিক সাহেদুল ইসলাম প্রায় সাত মাস আগে হাইকোর্টে জামিনের জন্য আবেদন করেছিলেন। গত বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলাম ও বিচারপতি আব্দুল্লাহ ইউসুফ সুমনের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে মামলাটি শুনানির জন্য ওঠে। সেই সময় কৌশলে মূল মামলার নথি আড়াল করে একটি সাধারণ মামলার এজাহার ও নথিপত্র আদালতের সামনে উপস্থাপন করা হয়, যেখানে ‘কুকি-চিন’ বা রাষ্ট্রবিরোধী কোনো অভিযোগের উল্লেখ ছিল না। আদালতকে অন্ধকারে রেখে সেই সাধারণ মামলার ভিত্তিতেই জামিন আদেশ দেওয়া হয় এবং বিচারপতিরা তাতে স্বাক্ষর করেন।

​আসল কারসাজি শুরু হয় বিচারপতিদের স্বাক্ষরিত সেই আদেশের নথিতে। জালিয়াতির মাধ্যমে আদেশের প্রথম পৃষ্ঠায় থাকা আগের মামলার তথ্য, থানার নাম ও অভিযোগের ধারাগুলো মুছে সেখানে সুকৌশলে কেএনএফের জন্য পোশাক তৈরির মামলার নম্বর ও ধারা বসিয়ে দেওয়া হয়। এই ভুয়া জামিননামা তৈরি করে তা কারা কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হলে, প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে প্রধান আসামি সাহেদুল ইসলাম কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে যান।

​উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ১৭ মে চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামি এলাকার ‘রিংভো অ্যাপারেলস’-এর একটি গুদামে অভিযান চালিয়ে ২০ হাজার ৩০০টি পোশাক জব্দ করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তদন্তে জানা যায়, প্রায় দুই কোটি টাকার বিনিময়ে পাহাড়ি সশস্ত্র গোষ্ঠী কেএনএফের জন্য এই বিশাল পোশাকের ক্রয়াদেশ দেওয়া হয়েছিল। এ ঘটনায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দায়ের করা মামলায় সাহেদুল ইসলামসহ গোলাম আজম ও নিয়াজ হায়দার নামে আরও দুজনকে আসামি করা হয়।

​সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন জানিয়েছে, উচ্চ আদালতের কোনো কর্মকর্তার সক্রিয় যোগসাজশ ছাড়া এমন নিখুঁত জালিয়াতি অসম্ভব। বরখাস্ত হওয়া বেঞ্চ কর্মকর্তা জাকির হোসেনকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে এবং এই চক্রের সঙ্গে ফৌজদারি শাখার অন্য কোনো কর্মচারী জড়িত কি না, তা খুঁজে বের করতে তদন্ত চলমান রয়েছে। বিচার বিভাগের পবিত্রতা রক্ষায় দোষীদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে প্রশাসন।

Advertisement
Advertisement
Advertisement