ডুবছে ঢাকা: উন্নয়নের স্তুতি ছাপিয়ে নগরবাসীর জলবন্দি হাহাকার

 প্রকাশ: ০৪ মে ২০২৬, ১১:৫৬ পূর্বাহ্ন   |   জাতীয়

ডুবছে ঢাকা: উন্নয়নের স্তুতি ছাপিয়ে নগরবাসীর জলবন্দি হাহাকার

​নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা

​আকাশের মেঘ জমলেই এখন আঁতকে ওঠেন রাজধানীবাসী। শ্রাবণের অঝোর ধারা নয়, সামান্য পশলা বৃষ্টিতেই ঢাকার ব্যস্ততম সড়কগুলো যখন মরণফাঁদে পরিণত হয়, তখন তাকে আর কেবল ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগ’ বলে দায় এড়ানোর সুযোগ থাকে না। বরং ধুঁকতে থাকা ড্রেনেজ ব্যবস্থা আর অপরিকল্পিত নগরায়নের চূড়ান্ত ব্যর্থতাই ফুটে উঠছে নিউমার্কেট থেকে মতিঝিল কিংবা ধানমন্ডি থেকে মালিবাগের প্রতিটি অলিতে-গলিতে।

​গতকাল দুপুরের সামান্য বৃষ্টিতে আবারও সেই চেনা নরক যন্ত্রণার সাক্ষী হলো নগরবাসী। নিউমার্কেট এলাকায় দেখা গেল এক বিষণ্ণ দৃশ্য। যেখানে হাজারো মানুষের কর্মব্যস্ততা থাকার কথা, সেখানে হাঁটু সমান নোংরা পানিতে হাবুডুবু খাচ্ছে ছোট-বড় যানবাহন। রিকশার সিট ছুঁইছুঁই পানিতে ভিজে গন্তব্যে ছুটছেন অফিসগামী মানুষ। কোথাও কোথাও পানি জমে আছে কোমর সমান। দোকানপাটে পানি ঢুকে নষ্ট হচ্ছে মূল্যবান পণ্য। এই চিত্র কেবল নিউমার্কেটের নয়; ধানমন্ডি ২৭, গ্রিন রোড, মগবাজার কিংবা ফকিরাপুলের অলিগলি এখন যেন একেকটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ।

​শিক্ষাবোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একজন ভুক্তভোগী আক্ষেপ করে বলছিলেন, "উন্নয়ন অনেক হচ্ছে, কিন্তু বৃষ্টির পর আমাদের কেন নৌকায় করে চলতে হবে, তার উত্তর কারো কাছে নেই।" ড্রেনেজ ব্যবস্থা সচল না থাকায় পানি নামতে সময় লাগছে দুই থেকে পাঁচ ঘণ্টা পর্যন্ত। এই দীর্ঘ সময়ে থমকে যাচ্ছে রাজধানীর অর্থনীতির চাকা, স্থবির হয়ে পড়ছে জনজীবন।

​নগরপরিকল্পনাবিদদের মতে, এই জলাবদ্ধতা কোনো আকস্মিক সমস্যা নয়, বরং দীর্ঘদিনের অবহেলা আর অব্যবস্থাপনার ফসল। পরিকল্পনাবিদ আদিল মোহাম্মদ খান মনে করেন, ড্রেন ও বক্স কালভার্টগুলো ময়লা-আবর্জনায় এতটাই ঠাসা যে, বৃষ্টির পানি প্রবাহিত হওয়ার কোনো পথ নেই। তার ওপর ড্রেনগুলোর সাথে প্রধান নালার সংযোগস্থলগুলো অকার্যকর হয়ে পড়েছে। বিগত সময়ে ঢাকঢোল পিটিয়ে নানা সংস্কারের কথা বলা হলেও মাঠ পর্যায়ে তার প্রতিফলন নেই বললেই চলে। শহরের চারপাশের জলাশয় ও খাল দখল হয়ে যাওয়ায় বৃষ্টির বাড়তি পানি যাওয়ার জায়গাটুকুও হারিয়েছে ঢাকা।

​তবে সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ দায় মানলেও সীমাবদ্ধতার কথা বলছেন। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আব্দুস সালামের মতে, বিশাল এই মহানগরের পানি নিষ্কাশনের জন্য মাত্র তিনটি পথ যথেষ্ট নয়। তিনি মনে করেন, অন্তত ১০টি ভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে যদি পানি নিষ্কাশন করে বুড়িগঙ্গা বা শীতলক্ষ্যায় নেওয়ার ব্যবস্থা করা যায়, তবেই স্থায়ী সমাধান সম্ভব। বর্তমানে পাম্প দিয়ে সাময়িকভাবে পানি সরানোর চেষ্টা চললেও তা যে সমুদ্রের মাঝে এক বিন্দু জলের মতো, তা বর্তমান পরিস্থিতিই বলে দিচ্ছে।

​বর্ষা মৌসুমের এখনো অনেকটা পথ বাকি। নগরবাসীদের মনে এখন একটাই শঙ্কা—সামান্য বৃষ্টিতেই যদি রাজধানীর এই দশা হয়, তবে ভারী বর্ষণে ঢাকার ভাগ্য কোন দিকে মোড় নেবে? স্থায়ী সমাধান না করে কেবল পাম্প আর সাময়িক তালি দিয়ে কি এই মেগাসিটিকে বাসযোগ্য রাখা সম্ভব? উত্তরটা মেঘাচ্ছন্ন আকাশের মতোই অস্পষ্ট রয়ে গেছে।

Advertisement
Advertisement
Advertisement