জ্বালানি সংকটে থমকে শিল্পচাকা, রপ্তানিতে নজিরবিহীন পতন

 প্রকাশ: ০৩ মে ২০২৬, ১২:৪৭ অপরাহ্ন   |   জাতীয়

জ্বালানি সংকটে থমকে শিল্পচাকা, রপ্তানিতে নজিরবিহীন পতন

ডেক্স নিউজ:

দেশের শিল্পাঞ্চলগুলোতে এখন যেন এক অদৃশ্য চাপা অস্থিরতা। গাজীপুরের একটি পোশাক কারখানার মেশিনগুলো আগের মতো আর টানা শব্দ তোলে না—মাঝেমধ্যেই থেমে যায় বিদ্যুতের অভাবে। কারখানার ম্যানেজার রফিকুল ইসলাম প্রতিদিনই নতুন হিসাব কষেন—কত ঘণ্টা উৎপাদন কমলো, কত অর্ডার ঝুলে গেল, আর কতটা আস্থা হারালো বিদেশি ক্রেতারা।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধকে কেন্দ্র করে বিশ্বজুড়ে যে জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে, তার ঢেউ এসে আঘাত করেছে বাংলাদেশের শিল্পখাতে। গ্যাসের চাপ কম, বিদ্যুৎ অনিয়মিত, আর জ্বালানি তেলের দাম ও সরবরাহ—দুটোই অনিশ্চিত। ফলে উৎপাদন যেন এক অনির্দেশ্য খেলায় পরিণত হয়েছে। যে কারখানাগুলো একসময় ২৪ ঘণ্টা সচল থাকত, এখন সেগুলো দিনে কয়েক ঘণ্টা বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে।

এই সংকটের সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে রপ্তানি খাতে। দেশের অর্থনীতির প্রাণ বলা হয় যে খাতকে, সেই খাতই এখন হোঁচট খাচ্ছে প্রতি মাসে। টানা আট মাস ধরে কমছে পণ্য রপ্তানি—এমন ঘটনা দেশের ইতিহাসে আগে দেখা যায়নি। মার্চ মাসে রপ্তানি আয় কমেছে ১৮ শতাংশের বেশি, যা শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়—এটি হাজারো কারখানার নিঃশব্দ সংকটের প্রতিচ্ছবি।

তৈরি পোশাক খাত, যা একাই দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি জোগান দেয়, সেখানেও ধস নেমেছে। বিদেশি ক্রেতারা সময়মতো পণ্য না পাওয়ায় ধীরে ধীরে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। কেউ চলে যাচ্ছেন ভারত, কেউ ভিয়েতনাম বা কম্বোডিয়ার বাজারে। কারণ তারা সেখানে পাচ্ছেন দ্রুত সরবরাহ, স্থিতিশীল উৎপাদন, আর কম ঝুঁকি।

কারখানার মালিকদের কাছে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু উৎপাদন নয়—টিকে থাকা। অনেকেই বাধ্য হয়ে ডিজেলচালিত জেনারেটরের ওপর নির্ভর করছেন। কিন্তু তাতেও সমস্যার শেষ নেই। ডিজেলের দাম বেড়েছে, সরবরাহ অনিশ্চিত, ফলে উৎপাদন খরচ তিনগুণ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলোর অবস্থা সবচেয়ে নাজুক—অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে।

এদিকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও তৈরি হয়েছে নতুন জটিলতা। গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে বিঘ্ন, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, আর দীর্ঘায়িত লিড টাইম—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে যাচ্ছে। যেখানে ভিয়েতনাম এক সপ্তাহে কাঁচামাল সংগ্রহ করতে পারে, সেখানে বাংলাদেশের লাগে প্রায় এক মাস। এই সময় ব্যবধানই এখন বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শিল্প মালিক ও অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা—দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। কারণ রপ্তানি কমে যাওয়া মানে শুধু আয় কমা নয়, এর সঙ্গে জড়িত লক্ষ লক্ষ শ্রমিকের জীবিকা, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা।

Advertisement
Advertisement
Advertisement