এআই শেয়ার উন্মাদনায় দক্ষিণ কোরিয়ায় নিঃস্ব নতুন বিনিয়োগকারীরা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
এআই প্রযুক্তির জন্য চিপের চাহিদা বাড়ায় বছরের শুরুতে দক্ষিণ কোরিয়ার শেয়ারবাজারে ব্যাপক উত্থান দেখা দেয়। সেই সুযোগে বিপুলসংখ্যক নতুন বিনিয়োগকারী বাজারে ঢোকেন। কিন্তু হঠাৎ ধস নামায় তাদের অনেকেই বড় অঙ্কের অর্থ হারিয়েছেন।
তাদেরই একজন ত্রিশের কোঠার সরকারি কর্মকর্তা উন-বি। আগামী বছরের এপ্রিলে বিয়ের খরচ জোগাড়ের লক্ষ্য নিয়ে বছরের শুরুতে নিজের সঞ্চয়ের বড় অংশ শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করেছিলেন তিনি।
মেমোরি চিপ নির্মাতা এসকে হাইনিক্সসহ বাজারের আলোচিত কয়েকটি কোম্পানির শেয়ার এবং যুক্তরাষ্ট্রের তালিকাভুক্ত একটি সেমিকন্ডাক্টর তহবিল কিনেছিলেন উন-বি। কিন্তু জুনের সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধান সূচক কসপি প্রায় ৪০ শতাংশ পড়ে গেলে তাঁর বিনিয়োগের মূল্যও কয়েক দশমিক হাজার ডলার কমে যায়।
এখন বিয়ের পরিকল্পনা নিয়েও নতুন করে ভাবতে হচ্ছে তাঁকে। উন-বি বলেন, বিয়ের আয়োজন ছোট করবেন, নাকি মধুচন্দ্রিমাই বাদ দেবেন—তা নিয়ে তিনি ভাবছেন।
উন-বি একা নন। দক্ষিণ কোরিয়ার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শেয়ারবাজার উত্থানের সময় লাখ লাখ মানুষ উৎসাহের সঙ্গে বিনিয়োগ করেছিলেন। শুরুতে বড় মুনাফা পেলেও বাজার ঘুরে দাঁড়ানোর আগেই তাদের অনেকের সেই লাভের বড় অংশ উধাও হয়ে গেছে।
ঋণ নিয়ে বিনিয়োগের ঝুঁকি
নতুন বিনিয়োগকারীদের অনেকেই প্রেসিডেন্ট লি জে-মিয়ংয়ের উৎসাহে শেয়ারবাজারে আসেন। দীর্ঘদিন আন্তর্জাতিক বাজারগুলোর তুলনায় পিছিয়ে থাকা দক্ষিণ কোরিয়ার শেয়ারবাজারকে সাধারণ মানুষের জন্য আরও কার্যকর করে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন লি।
জুনে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছানোর পর বাজারে তীব্র অস্থিরতা শুরু হয়। বুধবার কসপি প্রায় ৬ শতাংশ পড়ে যায়। এর আগের দিনও সূচকটি ১ দশমিক ৫৫ শতাংশ কমেছিল।
বছরের শুরু থেকে এখনো কসপি প্রায় ৫০ শতাংশ ওপরে রয়েছে। তবে সর্বকালের সর্বোচ্চ অবস্থানের তুলনায় এটি প্রায় ৩০ শতাংশ নিচে।
ভারী ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করায় ক্ষতির মাত্রা আরও বেড়েছে। কোরিয়া ফাইন্যান্সিয়াল ইনভেস্টমেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ের শেষে শেয়ার কেনার জন্য নেওয়া মার্জিন ঋণের পরিমাণ ছিল ২৮ দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন ওন বা প্রায় ২০ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার। জুনে এই ঋণের পরিমাণ উঠেছিল ৩৮ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ওন বা ২৭ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারে।
যেসব বিনিয়োগকারী লোকসান পূরণ করতে পারেননি, তাদের শেয়ার ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানগুলো বিক্রি করে দেওয়ায় মার্জিন ঋণের পরিমাণ কমেছে।
চিপের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা
বিশ্লেষকদের মতে, শুধু নতুন বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ দিয়ে কসপির এমন ওঠানামা ব্যাখ্যা করা যাবে না। সূচকের অর্ধেকেরও বেশি অংশজুড়ে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম বড় দুই চিপ নির্মাতা স্যামসাং ইলেকট্রনিক্স ও এসকে হাইনিক্স।
এআই প্রযুক্তির প্রসারের সঙ্গে মেমোরি চিপের চাহিদা বাড়তে থাকায় বছরের প্রথম ছয় মাসে কসপি দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে যায়। জুনের শেষে সূচকটি ১০১ দশমিক ১৪ শতাংশ বেড়ে বছরের প্রথমার্ধ শেষ করে।
জানুয়ারিতে কসপি ৫ হাজার পয়েন্ট ছাড়ায়। মে মাসে তা ৮ হাজার পয়েন্ট অতিক্রম করে। ১৯ জুন লেনদেনের একপর্যায়ে সূচকটি ৯ হাজার ৩৮৫ দশমিক ৫৯ পয়েন্টে উঠে যায়। কিন্তু ৩০ জুলাইয়ের মধ্যে সূচকটি তার বেশির ভাগ লাভ হারিয়ে ৫ হাজার ৫৯৫ পয়েন্টের নিচে নেমে আসে।
সরকারের নীতিও প্রশ্নের মুখে
লি সরকারের আমলে নিয়ন্ত্রকেরা আরও ঝুঁকিপূর্ণ কিছু বিনিয়োগপণ্য বাজারে অনুমোদন করেন। এর মধ্যে স্যামসাং ও এসকে হাইনিক্সের শেয়ারের দৈনিক ওঠানামার দ্বিগুণ হারে ওঠানামা অনুসরণ করে এমন এক্সচেঞ্জ-ট্রেডেড ফান্ড বা ইটিএফও ছিল।
২৭ মে এমন ১৮টি ইটিএফ বাজারে আসে। এর মাত্র তিন সপ্তাহ পরই শেয়ারবাজারে বড় পতন শুরু হয়।পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে ৩১ জুলাই কর্তৃপক্ষ লিভারেজড একক-শেয়ার ইটিএফ কেনাবেচার জন্য ন্যূনতম নগদ অর্থের পরিমাণ তিন গুণ বাড়িয়ে ৩০ মিলিয়ন ওন বা প্রায় ২১ হাজার ৪৫০ ডলার করে। নতুন নিয়মটি ৫ আগস্ট থেকে কার্যকর হওয়ার কথা থাকলেও তা এগিয়ে আনা হয়।
রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে লির ওপর
শেয়ারবাজারের অস্থিরতার প্রভাব পড়েছে প্রেসিডেন্ট লির জনপ্রিয়তায়ও। রিয়েলমিটারের ১০ থেকে ১৪ আগস্টের জরিপে তাঁর অনুমোদনের হার টানা পঞ্চম সপ্তাহের মতো কমে ৪৩ শতাংশে নেমেছে, যা তাঁর প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর সর্বনিম্ন।
ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার সংস্কার ও ধনী বাড়ির মালিকদের ওপর প্রস্তাবিত সম্পত্তি কর বৃদ্ধির মতো অন্যান্য বিষয়ও জনসমর্থন কমার পেছনে রয়েছে। তবে জরিপ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানটি শেয়ারবাজারের বড় পতন এবং একক-শেয়ার লিভারেজড ইটিএফ অনুমোদন নিয়ে বিতর্ককেও গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
নির্বাচনী প্রচারে কসপিকে ৫ হাজার পয়েন্টে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন লি। এখন সেই প্রচেষ্টাই রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের সমালোচনার লক্ষ্য হয়ে উঠেছে।
সাবেক বিচারমন্ত্রী চো কুক অভিযোগ করেছেন, একক-শেয়ার লিভারেজড ইটিএফ চালুর সিদ্ধান্ত সরকারের নীতিগত ব্যর্থতা। তাঁর মতে, সরকারের ওপর আস্থা রেখে বিনিয়োগ করা তরুণেরা এমন একটি ঋণের ফাঁদে পড়েছেন, যার প্রভাব তাদের দীর্ঘদিন বয়ে বেড়াতে হতে পারে।
তবে সব বিশ্লেষক সরকারের ঘাড়ে দায় চাপাতে রাজি নন। ডানকুক বিশ্ববিদ্যালয়ের কোরীয় রাজনীতির বিশেষজ্ঞ বেঞ্জামিন এনগেল বলেন, বাজার ওঠানামার জন্য রাজনীতিকদের দায়ী করা নতুন কিছু নয়। তবে অনেক মানুষ ঋণ নিয়ে অতিরিক্ত বিনিয়োগ করেছিলেন, আর বাজারের স্বাভাবিক পতন এলে তাদের আর্থিক সমস্যায় পড়ার আশঙ্কা ছিল।
‘পরিচিত’ শেয়ারে ঝুঁকি ভুলে গিয়েছিলেন বিনিয়োগকারীরা
লিভারেজ শেয়ারসের এশিয়া বিভাগের প্রধান বোরা কিম বলেন, দক্ষিণ কোরিয়ার সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সবাই নতুন নন। বিশেষ করে ৩০ থেকে ৫০ বছর বয়সী অনেক বিনিয়োগকারী দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি কোম্পানির শেয়ারে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করে আসছেন।
তবে স্যামসাং ও এসকে হাইনিক্সের মতো পরিচিত দুই কোম্পানির ওপর ভিত্তি করে লিভারেজড ইটিএফ চালু হওয়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়েছিল বলে মনে করেন তিনি।
উন-বি নিজে কোনো দেশীয় লিভারেজড পণ্য কেনেননি। তবে এর কারণ ছিল, সে সময় তাঁর হাতে বিনিয়োগ করার মতো অতিরিক্ত অর্থ ছিল না।
সরকারকে নিজের ক্ষতির জন্য দায়ী করছেন না তিনি। তাঁর মতে, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগে উৎসাহ দেওয়ার জন্য প্রেসিডেন্ট বা সরকারের ওপর দায় চাপানো ঠিক হবে না। বিদেশেও এমন লিভারেজড পণ্য রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
তবে সাম্প্রতিক ক্ষতি তাঁর বিনিয়োগের কৌশল বদলে দিয়েছে। এখন থেকে বিভিন্ন খাত ও কোম্পানিতে অর্থ ছড়িয়ে বিনিয়োগ করার কথা ভাবছেন তিনি।
বিয়ের আগে চলতি বছরের দ্বিতীয়ার্ধ এবং আগামী বছরের প্রথমার্ধের বাজার পরিস্থিতি দেখবেন উন-বি। এরপর বিনিয়োগ করা সব অর্থ নগদে ফিরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করেছেন তিনি।
সূত্র: আলজাজিরা