ন্যাটো মিত্রদের রাজনৈতিক আনুগত্য যাচাই করছে পেন্টাগন
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ন্যাটো-ভাবনার সঙ্গে মিত্র দেশগুলো কতটা সামঞ্জস্য রেখে চলছে, তা জানতে দীর্ঘ প্রশ্নমালা পাঠিয়েছে পেন্টাগন। আল জাজিরার হাতে একান্তভাবে আসা নথি থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
তিন পৃষ্ঠার ওই নথির শিরোনাম ‘Questions for NATO Allies & Other Key Stakeholders’। ইউরোপে মোতায়েন মার্কিন বাহিনী নিয়ে পেন্টাগনের চলমান ছয় মাসের পর্যালোচনায় ন্যাটো মিত্রদের সঙ্গে আলোচনার দিকনির্দেশনা হিসেবে প্রশ্নগুলো তৈরি করা হয়েছে বলে নথির ভাষা ও চিহ্ন থেকে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রশ্নমালায় সরাসরি জানতে চাওয়া হয়েছে, মিত্র দেশগুলো ‘মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকারকে প্রকাশ্যে সমর্থন’ করছে কি না। আরেকটি প্রশ্নে জানতে চাওয়া হয়েছে, দেশটি মার্কিন নীতির সঙ্গে ‘শক্ত, স্পষ্ট ও নীরব’ অবস্থানের কতটা মিল রেখেছে। মে মাসে সিঙ্গাপুরের শাংগ্রি-লা সংলাপে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের বক্তব্যে ব্যবহৃত একটি বাক্য থেকেই এই শব্দবন্ধ নেওয়া হয়েছে।
সবচেয়ে স্পষ্ট রাজনৈতিক প্রশ্নগুলো রয়েছে নথির শেষ দিকে। কোনো মিত্র দেশ মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারে বা তাদের আকাশসীমার ওপর দিয়ে মার্কিন সামরিক উড়োজাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে কি না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে। এরপর প্রশ্ন করা হয়েছে, এসব বিধিনিষেধ কমানো বা পুরোপুরি তুলে নিতে তারা রাজি কি না।
ইরান-সংক্রান্ত যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর ইউরোপের কয়েকটি দেশ মার্কিন সামরিক বিমান ও ঘাঁটি ব্যবহারে বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল।
ন্যাটোর বাইরে ইরান যুদ্ধ
বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসন ন্যাটোর আওতার বাইরে থাকা ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের আরও বেশি সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করছে।
ন্যাটো মিত্র দেশের এক জ্যেষ্ঠ প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বর্তমান প্রশাসন ন্যাটোর বিষয়গুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা সামরিক অভিযানকে গুলিয়ে ফেলছে। তাঁর মতে, এই প্রশ্নমালাতেও সেই বিভ্রান্তির প্রতিফলন রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে ন্যাটোর কোনো সম্পর্ক নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
প্রশ্নমালায় ট্রাম্প প্রশাসনের ‘NATO 3.0’ ধারণার প্রতি মিত্রদের সমর্থন আছে কি না, সেটিও জানতে চাওয়া হয়েছে। এই ধারণায় ইউরোপীয় মিত্রদের নিজেদের প্রতিরক্ষার জন্য আরও বেশি দায়িত্ব নেওয়ার কথা বলা হয়েছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা হবে তুলনামূলক সীমিত।
এ ছাড়া প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় বাড়ানো, ন্যাটোর কমান্ড কাঠামো ও সামরিক বাহিনীতে আরও বেশি অবদান রাখার বিষয়েও ট্রাম্পের দাবির প্রতিফলন রয়েছে প্রশ্নমালায়।
স্পেনের সঙ্গে পুরোনো বিরোধ
প্রশ্নমালায় ওঠা কিছু বিষয় নিয়ে এরই মধ্যে কয়েকটি দেশের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরোধ রয়েছে। এর মধ্যে স্পেন অন্যতম।
ন্যাটো সদস্যদের ২০২৫ সালের একটি চুক্তি অনুযায়ী প্রতিরক্ষা ব্যয় মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৫ শতাংশে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। স্পেন এই লক্ষ্য থেকে ছাড় চাওয়ায় ট্রাম্প দেশটির সমালোচনা করে আসছেন।
এর আগে মার্চে স্পেন মার্কিন সামরিক উড়োজাহাজের জন্য নিজেদের আকাশসীমা বন্ধ করে দেয় এবং ইরানের বিরুদ্ধে হামলায় যুক্তরাষ্ট্রকে দেশটির সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানায়। এর প্রতিক্রিয়ায় মাদ্রিদের সঙ্গে বাণিজ্য কমিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন ট্রাম্প।
এক জ্যেষ্ঠ ইউরোপীয় কর্মকর্তা বলেন, প্রশ্নমালায় সরাসরি রাজনৈতিক আনুগত্যের সঙ্গে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়নি। তবে এতে পেন্টাগনের ‘প্রতিশোধমূলক’ মনোভাব নিয়ে নির্দিষ্ট কিছু সামরিক উপস্থিতি কমানোর যুক্তি তৈরির চেষ্টা প্রতিফলিত হয়েছে।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, প্রশ্নমালার মাধ্যমে মিত্রদের কাছে এমন বার্তা দেওয়া হচ্ছে যে, হোয়াইট হাউসের নীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সামঞ্জস্য রেখে চলাই তাদের জন্য সুবিধাজনক।
পেন্টাগন এ বিষয়ে আল জাজিরার প্রশ্নের তাৎক্ষণিক কোনো জবাব দেয়নি।যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক উপ-সহকারী প্রতিরক্ষামন্ত্রী জিম টাউনসেন্ড বলেন, এ ধরনের বিষয় ডেমোক্র্যাট বা রিপাবলিকান-দুই প্রশাসনের সময়ই আলোচনায় আসে। তবে বর্তমান প্রশাসন বিশেষভাবে আনুগত্যকে গুরুত্ব দেয়। মিত্রদের কাছ থেকেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ও সমর্থন নিয়ে ট্রাম্প কঠোরভাবে নিজের প্রত্যাশার কথা জানিয়েছেন।
সূত্র:আলজাজিরা