ইরানের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন অর্থনৈতিক যুদ্ধের হুমকি ট্রাম্পের
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
ইরানের বিরুদ্ধে ‘এখন পর্যন্ত কোনো দেশের ওপর নেওয়া সবচেয়ে কঠোর অর্থনৈতিক অভিযান’ চালানোর হুমকি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে ইরানের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য করা যেকোনো দেশকে ‘ভয়াবহ অর্থনৈতিক পরিণতি’ ভোগ করতে হবে বলেও সতর্ক করেছেন তিনি।
বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, চুক্তিতে পৌঁছানোর সুযোগ ইরান কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছে। এ কারণে দেশটির বিরুদ্ধে নজিরবিহীন মাত্রায় ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধ ও বিচ্ছিন্নতা’ চালানো হবে।
ট্রাম্প বলেন, ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা কোনো দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বিমানবন্দর বা সরকারি সংস্থা যদি তেহরানকে কোনো ধরনের সহায়তা দেয়, তাহলে ওই দেশও কঠোর অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মুখে পড়বে।
তেল পাচার, অর্থ বিনিময়ের ব্যবস্থা, নগদ অর্থ স্থানান্তর, মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠান, জাহাজ নিবন্ধন এবং ভুয়া কোম্পানির মাধ্যমে ব্যবসা-সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি। ট্রাম্প এটিকে ‘অর্থনৈতিক ডি-ডে’ হিসেবে বর্ণনা করে ইরানকে বিচ্ছিন্ন করতে মিত্র দেশগুলোর সহযোগিতা চান।
ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার হুমকি ট্রাম্পের জন্য নতুন নয়। এপ্রিল থেকে তাঁর প্রশাসন ‘অপারেশন ইকোনমিক ফিউরি’ নামে চাপ প্রয়োগের কর্মসূচি চালিয়ে আসছে। এর লক্ষ্য ইরানকে বিচ্ছিন্ন করা এবং দেশটির আয়ের উৎসগুলো বন্ধ করা।
এরই মধ্যে ইরানের তেল, জাহাজ চলাচল ও আর্থিক খাতের ওপর ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের জ্বালানি রপ্তানি থেকে আয় কমানোর পাশাপাশি দেশটির বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধও চালু করেছে ওয়াশিংটন। বিদেশে ইরানি তেল বিক্রিতে সহায়তার অভিযোগে বিভিন্ন কোম্পানি, মধ্যস্থতাকারী ও তেলবাহী ট্যাংকারও নিষেধাজ্ঞার আওতায় এসেছে।
‘হতাশার প্রকাশ’
ওয়াশিংটন থেকে আল জাজিরার সাংবাদিক মাইক হানা বলেন, ট্রাম্পের সর্বশেষ ঘোষণায় এক ধরনের ‘হতাশা’ প্রকাশ পেয়েছে।
তাঁর প্রশ্ন, ইরানের ওপর ইতিমধ্যে যেসব অর্থনৈতিক চাপ রয়েছে, তার বাইরে ট্রাম্প আর কী ধরনের ব্যবস্থা নিতে পারেন? ট্রাম্প তাঁর পোস্টে নতুন কোনো নির্দিষ্ট পদক্ষেপের কথা জানাননি।
হানার মতে, ইরানকে দেওয়া নতুন হুমকি দেশটির কাছে আরেকটি কড়া বক্তব্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে এর লক্ষ্য সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের জনগণও। চলমান সংঘাত নিয়ে দেশের অভ্যন্তরে বিরোধিতা থাকায় ট্রাম্প শক্ত অবস্থান নেওয়ার বার্তা দিতে চাইছেন বলে মনে করেন তিনি।
চীনের সঙ্গে বাড়তে পারে টানাপোড়েন
বিশ্লেষকদের ধারণা, নতুন নিষেধাজ্ঞার আওতায় চীন, ইরাক ও তুরস্কের মতো দেশও পড়তে পারে। বিশেষ করে ইরানের তেল কেনাবেচায় যুক্ত চীনা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারেন ট্রাম্প।
ব্র্যান্ডাইস বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য অর্থনীতির অধ্যাপক নাদের হাবিবি বলেন, চীনের স্বাধীন মালিকানাধীন ছোট তেল শোধনাগারগুলো এখনো ইরানি তেল কিনছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা ওয়াশিংটনের জন্য বড় একটি হাতিয়ার হতে পারে।
তবে এতে যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কে বড় ধরনের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। চীন এরই মধ্যে দেশটির প্রতিষ্ঠানগুলোকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা মেনে ইরানের সঙ্গে সহযোগিতা না করার বিষয়ে সতর্ক করেছে। একই সময়ে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে বাণিজ্য আলোচনা চলছে। ফলে চীনা প্রতিষ্ঠান বা ব্যাংকের বিরুদ্ধে নতুন ব্যবস্থা নেওয়া হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
ইরানের সঙ্গে তুরস্ক, ইরাক ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর স্থলবাণিজ্য পুরোপুরি বন্ধ করাও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কঠিন হবে বলে মনে করেন হাবিবি। তাঁর মতে, এসব সীমান্তে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন হবে।
অবসিডিয়ান রিস্ক অ্যাডভাইজারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ব্রেট এরিকসন বলেন, এত দিন এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি কারণ এর ঝুঁকি অনেক বেশি। তাঁর মতে, চীনা ব্যাংকগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা ট্রাম্পের হাতে সবচেয়ে কার্যকর অর্থনৈতিক চাপের অস্ত্র হতে পারে। তবে এতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে এবং যুদ্ধের গতিপথ বদলানোর নিশ্চয়তাও নেই।
এরিকসনের ভাষায়, অর্থনৈতিক চাপকে দ্রুত ফল দিতে হবে। আর সে ক্ষেত্রে চীনা ব্যাংকগুলোকে নিশানা করাই সবচেয়ে কার্যকর পথ-যদিও এমন পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘রেডলাইন’ অতিক্রম করার শামিল হতে পারে।
সূত্র: আলজাজিরা