শিল্পের ভালোবাসায় আরবি সংস্কৃতির নতুন প্ল্যাটফর্ম

 প্রকাশ: ১৫ অগাস্ট ২০২৬, ১০:২৭ পূর্বাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

শিল্পের ভালোবাসায় আরবি সংস্কৃতির নতুন প্ল্যাটফর্ম

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

বড় বড় গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল কনটেন্ট টিম গড়ে তোলা ও পরিচালনার বহু বছরের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে নিজের উদ্যোগ শুরু করেছেন সৌদি মিডিয়া কনটেন্ট নির্মাতা ফারাহ আল-ইব্রাহিম। শিল্প, শিল্পী ও সংস্কৃতির গল্প সাধারণ মানুষের কাছে সহজভাবে তুলে ধরতে ২০২৫ সালে তিনি চালু করেন স্বাধীন আরবি সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্ম ‘ফান কালচার’।

ফারাহর লক্ষ্য, শিল্প নিয়ে জানতে আগ্রহী হলেও যাদের প্রাতিষ্ঠানিক বা একাডেমিক জ্ঞান নেই, তাদের জন্য বিষয়গুলো সহজ ও আকর্ষণীয় করে তোলা। তাঁর ভাষায়, গণমাধ্যম ছেড়ে আসা নয়, বরং সেখানে অর্জিত অভিজ্ঞতাই নিজের প্ল্যাটফর্ম তৈরির ভিত্তি হয়েছে।

‘আমি এটিকে গণমাধ্যম থেকে সরে আসা হিসেবে দেখি না। অনেক দিক থেকেই ফান কালচার গণমাধ্যমে কাজ করে যা শিখেছি, তারই ফল,’ বলেন তিনি।

শারজাহর আমেরিকান ইউনিভার্সিটি থেকে গণযোগাযোগ বিষয়ে পড়াশোনা করা ফারাহ ২০১২ সালে ডিজিটাল কনটেন্ট নিয়ে পেশাজীবন শুরু করেন। তখন প্রচলিত গণমাধ্যমে ডিজিটাল টিমের কার্যক্রমও ধীরে ধীরে গড়ে উঠছিল।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রযোজক হিসেবে কাজ শুরু করে পরে ব্যবস্থাপনায় যান তিনি। একসময় সাইয়িদাতিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবস্থাপক এবং পরে এমবিসি গ্রুপের আল আরাবিয়ায় ডিজিটাল কনটেন্ট ব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

এই অভিজ্ঞতা তাঁকে শুধু কনটেন্ট তৈরি করাই শেখায়নি, দর্শকদের বোঝা এবং কার্যকরভাবে গল্প বলার কৌশলও শিখিয়েছে। তাঁর মতে, গল্প বলাই তাঁদের কাজের মূল ভিত্তি।

শিল্পকে সহজ করে তোলার চেষ্টা

সৌদি আরবে নতুন নতুন প্রদর্শনী, জাদুঘর, শিল্পী ও সাংস্কৃতিক আয়োজন বাড়তে থাকায় ফারাহ এমন আরবি কনটেন্ট খুঁজছিলেন, যেখানে বিষয়বস্তুর গভীরতা থাকবে, কিন্তু ভাষা হবে সহজবোধ্য।

তিনি বলেন, একজন দর্শক পিকাসোর প্রদর্শনীতে গিয়ে শিল্পকর্ম উপভোগ করতে পারেন। কিন্তু কিউবিজম কীভাবে শুরু হয়েছিল, পিকাসো কীভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন এবং শিল্পকর্মগুলোর পেছনের গল্প জানলে সেই অভিজ্ঞতা একেবারেই বদলে যায়।

কিন্তু আরবি ভাষায় গভীর তথ্যসমৃদ্ধ অথচ সহজ ও আকর্ষণীয় কনটেন্ট খুঁজে পাওয়া কঠিন ছিল তাঁর জন্য।

‘আমার মনে হয়েছে, মাঝামাঝি একটি জায়গা থাকা দরকার-যেখানে প্রকৃত বিষয়বস্তু থাকবে, কিন্তু এমনভাবে উপস্থাপন করা হবে, যা মানুষ উপভোগ করবে, অনুসরণ করবে এবং অন্যদের সঙ্গে শেয়ার করবে,’ বলেন ফারাহ।

সেই ভাবনা থেকেই জন্ম নেয় ফান কালচার।

কোনো শিল্পকর্ম বা শিল্পধারা শুধু ব্যাখ্যা করার বদলে এর পেছনের মানুষ, ইতিহাস কিংবা ধারণাকে সামনে আনে প্ল্যাটফর্মটি। লক্ষ্য হলো দর্শকের মনে কৌতূহল তৈরি করা, যাতে তারা আরও জানতে এবং অনুসন্ধান করতে আগ্রহী হন।

এক বছরে লাখো দর্শক

ফারাহ শুরু করেছিলেন ছোট পরিসরে। বড় কোনো গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের কাঠামো অনুকরণ না করে প্রথমে ইনস্টাগ্রামে কাজ শুরু করেন। লক্ষ্য ছিল একটি কাজ ভালোভাবে করা।

পরে ফান কালচার টিকটকেও ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে দুই প্ল্যাটফর্মে অনুসারীর সংখ্যা ১ লাখ ছাড়িয়েছে। প্রথম বছরেই কনটেন্টগুলো পেয়েছে লাখ লাখ ভিউ।

তবে ফারাহর কাছে অনুসারীর সংখ্যা সবচেয়ে বড় অর্জন নয়। তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে কনটেন্টকে ঘিরে একটি সক্রিয় সম্প্রদায় তৈরি হওয়া।

শিল্পী, সংগ্রাহক এবং শিল্প বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকা তরুণেরা কনটেন্টে যুক্ত হচ্ছেন, আবার ফিরে আসছেন এবং নিজেদের জ্ঞান ও মতামতও তুলে ধরছেন।

ফারাহর মতে, এর মাধ্যমে শিল্প নিয়ে কথা বলার ক্ষেত্রে একটি প্রচলিত ধারণাও বদলাচ্ছে—শিল্প নিয়ে মতামত দিতে হলে বিশেষজ্ঞ হতে হবে, এমন নয়।

‘শিল্প নিয়ে নিজের প্রতিক্রিয়া জানানোর জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই,’ বলেন তিনি।

কৌতূহল থেকেই সাংস্কৃতিক জ্ঞান

তরুণদের মধ্যে সাংস্কৃতিক জ্ঞান গড়ে তুলতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন ফারাহ।

তবে ছোট ভিডিওকে বই, জাদুঘর কিংবা গভীরভাবে শেখার বিকল্প হিসেবে দেখেন না তিনি। বরং এগুলোকে আরও জানার প্রবেশদ্বার হিসেবে দেখেন।

‘এক মিনিটের একটি ভিডিও কাউকে আরও পড়তে, কোনো প্রদর্শনীতে যেতে কিংবা একটি শিল্পকর্মকে ভিন্নভাবে দেখতে আগ্রহী করে তুলতে পারে। আমার কাছে সাংস্কৃতিক জ্ঞান অর্জনের শুরুটা এই কৌতূহল থেকেই,’ বলেন তিনি।

সৌদি আরবে নতুন নতুন প্রদর্শনী, জাদুঘর ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠায় তরুণদের সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগও বাড়ছে বলে মনে করেন ফারাহ।

তাঁর ভাষায়, সংস্কৃতি এখন আর শুধু বিশেষজ্ঞদের জন্য নির্ধারিত কোনো বিষয় নয়; বরং তা মানুষের দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক অংশ হয়ে উঠছে।

সৌদি থেকে আরব বিশ্বে

সৌদি আরবকে কেন্দ্র করে শুরু হলেও ফান কালচারকে শুরু থেকেই বৃহত্তর আরবি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখেছেন ফারাহ। সাইয়িদাতি ও আল আরাবিয়ায় কাজের সময় সৌদি পরিচয় বজায় রেখেও বৃহত্তর আরব দর্শকদের জন্য কনটেন্ট তৈরির অভিজ্ঞতা তাঁর এই ভাবনাকে প্রভাবিত করেছে।

এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গণ্ডি পেরিয়ে আরও বড় পরিসরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে ফান কালচার।

সেপ্টেম্বরে প্ল্যাটফর্মটির প্রথম ডিজিটাল বই প্রকাশিত হবে। আধুনিক শিল্পের ইতিহাস গল্প বলার মাধ্যমে পাঠকদের কাছে তুলে ধরা হবে বইটিতে, যার শুরু হবে রিয়ালিজম দিয়ে।

ফান কালচারের অনুসারীরা ফারাহর কাছে এমন আরবি শিল্প-ইতিহাসের বইয়ের সুপারিশ চাইতেন, যেগুলো তথ্যবহুল কিন্তু অতিরিক্ত একাডেমিক নয়। উপযুক্ত বই খুঁজে না পেয়ে শেষ পর্যন্ত নিজেই একটি বই তৈরির সিদ্ধান্ত নেন তিনি। এ কাজে গবেষণা ও নির্ভরযোগ্য সূত্র ব্যবহার করা হয়েছে।

ডিজিটাল বইটি তাঁর বড় পরিকল্পনার প্রথম ধাপ মাত্র। আগামী পাঁচ বছরে ফান কালচারকে সংগীত, থিয়েটার, ঐতিহ্য, ইতিহাস, ফ্যাশন, খাবার, ভ্রমণ এবং এসব ক্ষেত্রের মানুষের গল্প নিয়ে একটি বিস্তৃত আরবি সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্মে পরিণত করতে চান ফারাহ।

ভিডিও, প্রামাণ্যচিত্র, বই, অডিওসহ বিভিন্ন মাধ্যম একত্র করে একটি মাল্টিমিডিয়া লাইব্রেরি গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে তাঁর। এমন একটি জায়গা, যেখানে দর্শকেরা নতুন কিছু আবিষ্কার করতে বারবার ফিরে আসতে পারবেন।

বর্তমানে ফান কালচারের পুরো কার্যক্রম একাই পরিচালনা করেন ফারাহ। প্রয়োজনে একজন বা দুজন ফ্রিল্যান্সার তাঁকে সহায়তা করেন।

নিজের এই উদ্যোগে সবচেয়ে বড় বিস্ময় হিসেবে তিনি আবারও কনটেন্ট তৈরির প্রতি নিজের ভালোবাসা ফিরে পাওয়ার কথা বলেন।

‘আমি বুঝতে পেরেছি, আসলে কনটেন্ট তৈরি করাটাই এখনো আমার সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে।’

এই যাত্রায় নিজের উদ্যোক্তা সত্তারও নতুন করে পরিচয় পেয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে পেয়েছেন আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি উত্তর-ভিন্নভাবে বলা আরবি শিল্প ও সংস্কৃতির গল্পের জন্য দর্শক তৈরি আছে।

Advertisement
Advertisement
Advertisement