শুধু শক্তির ভাষা বোঝে ইসরায়েল, বললেন কাসেম

 প্রকাশ: ১৫ অগাস্ট ২০২৬, ১০:৩৭ পূর্বাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

শুধু শক্তির ভাষা বোঝে ইসরায়েল, বললেন কাসেম

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

ইসরায়েল ‘শুধু শক্তির ভাষা বোঝে’ বলে মন্তব্য করেছেন হিজবুল্লাহর মহাসচিব শেখ নাঈম কাসেম। ২০০৬ সালে লেবাননের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের ৩৩ দিনের যুদ্ধের অভিজ্ঞতা এ কথার প্রমাণ বলেও দাবি করেছেন তিনি।

শুক্রবার টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে ২০০৬ সালের যুদ্ধে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে হিজবুল্লাহর বিজয়ের বার্ষিকী উপলক্ষে এসব কথা বলেন কাসেম।

তিনি বলেন, ইসরায়েলি কারাগারে আটক লেবানিজ বন্দীদের মুক্তির লক্ষ্যে হিজবুল্লাহ দুই ইসরায়েলি সেনাকে আটক করেছিল। তাঁদের আটক করার আগে বন্দীদের মুক্তির জন্য যোগাযোগ ও কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা ব্যর্থ হয়েছিল।

কাসেম বলেন, ‘কারাগারে থাকা আমাদের বন্দীদের পরিত্যাগ করব না-এই প্রতিশ্রুতি পূরণে ওই পদক্ষেপ প্রয়োজন ছিল। তাহলে ইসরায়েলি শত্রুর বিরুদ্ধে মোকাবিলা ও চাপ প্রয়োগ ছাড়া কীভাবে সমীকরণ বদলানো সম্ভব ছিল, যে শত্রু শুধু শক্তির ভাষা বোঝে?’

তাঁর দাবি, সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে হিজবুল্লাহর ওই অভিযান ইসরায়েলের আগ্রাসনকে বৈধতা দেয়নি। তবে পরে স্পষ্ট হয়, ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতায় ২০০৬ সালের সেপ্টেম্বরেই বড় ধরনের যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছিল।

কাসেম বলেন, লেবাননের সেনাবাহিনী, জনগণ ও প্রতিরোধ শক্তির ঐক্যের কারণে ৩৩ দিনের যুদ্ধ ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ‘অহংকারী’ অবস্থানের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে শেষ হয়। এই বিজয়ের ফলে লেবানিজ বন্দীদের মুক্তিও নিশ্চিত হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি।

২০০৬ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত প্রতিরোধের ‘নিরোধ’

হিজবুল্লাহ প্রধানের দাবি, ২০০৬ সালের যুদ্ধের পর ২০২৩ সাল পর্যন্ত ইসরায়েলের বিরুদ্ধে একটি প্রতিরোধমূলক ভারসাম্য তৈরি হয়েছিল। তাঁর মতে, এই ঘটনা প্রতিরোধের গুরুত্বও প্রমাণ করেছে।

‘এটি এমন একটি দৃষ্টান্ত, যেখানে প্রতিরোধ শক্তি সমীকরণ বদলাতে সক্ষম। এটি একটি চলমান ও বাস্তব অভিজ্ঞতা,’ বলেন তিনি।

২০০৬ সালের ৩৩ দিনের যুদ্ধ ১৪ আগস্ট শেষ হয়। হিজবুল্লাহ ওই যুদ্ধকে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের বিজয় হিসেবে বর্ণনা করে।

মার্চে শুরু হওয়া ইসরায়েলি সর্বশেষ হামলার প্রসঙ্গ টেনে কাসেম বলেন, তাঁদের কাছে এই যুদ্ধ ছিল অস্তিত্বের প্রশ্নে একটি আগ্রাসী যুদ্ধ।

তিনি বলেন, হিজবুল্লাহ যোদ্ধারা ‘কারবালার মতো’ এক লড়াইয়ের মুখোমুখি হয়েছিলেন, যেখানে তাঁদের সামনে ছিল দুটি পথ-‘হয় আমরা ভেঙে পড়ে আত্মসমর্পণ করব এবং ইসরায়েলিরা জয়ী হবে, অথবা আমরা দৃঢ় থাকব এবং ইসরায়েলি প্রকল্পকে পরাজিত করব।’

কাসেম দাবি করেন, হিজবুল্লাহ ইসরায়েলি যুদ্ধের লক্ষ্যগুলো ব্যর্থ করে দিয়েছে এবং ভবিষ্যতেও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ চালিয়ে যাবে।

‘যে আমাদের আত্মসমর্পণের ওপর বাজি ধরে, সে মরীচিকার ওপর বাজি ধরে এবং প্রতিরোধকে ভালোভাবে চেনে না,’ বলেন তিনি।

লেবানন সরকারেরও সমালোচনা

ইসরায়েলের সঙ্গে কাঠামোগত চুক্তি সই এবং দেশটির ‘নির্দেশনা’ মেনে নেওয়ার জন্য লেবাননের কর্তৃপক্ষেরও সমালোচনা করেন কাসেম। তাঁর অভিযোগ, এর মাধ্যমে লেবানন কার্যত নিজেদের সার্বভৌমত্ব ছেড়ে দিয়েছে।

তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন ইসরায়েলকে এ অঞ্চলে আগ্রাসন ও গণহত্যা চালাতে আরও উৎসাহিত করেছে।

বাড়িঘর ও গ্রাম ধ্বংস, লেবাননের ভূখণ্ড দখল এবং মানুষ হত্যার মতো কর্মকাণ্ডের উল্লেখ করে কাসেম বৈরুত সরকারের প্রতি চুক্তি থেকে সরে আসার আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, ‘এই গুরুতর পাপ, এই লজ্জাজনক ভুল, এই অপমানজনক ভুল থেকে ফিরে আসুন।’

বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘আত্মসমর্পণ’ হিসেবে বর্ণনা করে কাসেম বলেন, ‘আমরা আত্মসমর্পণ মেনে নেব না। আমরা দৃঢ় থাকব এবং আমাদের দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন কিংবা শহীদদের রক্ত বৃথা যেতে দেব না।’

কাসেমের দাবি, ইসরায়েলি হামলা ও ধ্বংসযজ্ঞ ঠেকানোর পেছনে প্রতিরোধের দৃঢ় অবস্থানের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যেকোনো যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে লেবাননকে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে ইরানের অনড় অবস্থানও ভূমিকা রেখেছে।

তিনি বলেন, কেউ কেউ দাবি করছেন কাঠামোগত চুক্তির কারণে ৩ লাখ মানুষ দক্ষিণ লেবাননে ফিরে গেছেন। তাঁর মতে, এটি হাস্যকর দাবি। ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইসলামাবাদ চুক্তি’র কারণেই মানুষ ফিরেছে এবং বিস্তৃত অর্থে যুদ্ধও ওই চুক্তির কারণেই থেমেছিল বলে দাবি করেন তিনি।

কাসেম পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় জুনে স্বাক্ষরিত ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকের কথা উল্লেখ করেন। যুদ্ধ বন্ধের উদ্দেশ্যে ওই সমঝোতা হলেও পরে যুক্তরাষ্ট্রের লঙ্ঘনের অভিযোগে তা ভেঙে পড়ে।

তিনি আবারও বলেন, প্রতিরোধ শক্তি শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হবে। ‘সৃষ্টিকর্তা চাইলে আমরা বিজয়ের আরও ধাপ দেখব। সব কষ্ট সত্ত্বেও আমাদের সহ্য করতে হবে, কারণ আমরা দাঁড়িয়ে আছি এবং আমাদের দৃঢ়তা বিজয়ের পথে একটি ধাপ,’ বলেন কাসেম।

লেবাননের সরকারি হিসাব অনুযায়ী, গত ২ মার্চ থেকে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৪ হাজার ৩৩৩ জন নিহত ও ১২ হাজার ২৩৬ জনের বেশি আহত হয়েছেন। বাস্তুচ্যুত হয়েছেন ১০ লাখের বেশি মানুষ।

দক্ষিণ লেবাননের বিভিন্ন এলাকায় এখনো ইসরায়েলি বাহিনী অবস্থান করছে। এর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে দখলে থাকা কিছু এলাকা যেমন রয়েছে, তেমনি ২০২৩-২৪ সালের সামরিক অভিযানের সময় দখল করা এলাকাও রয়েছে।

Advertisement
Advertisement
Advertisement