হরমুজ প্রণালীকে মার্কিন ভূখণ্ড ঘোষণার হুমকি ট্রাম্পের
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ ঘিরে উত্তেজনা বাড়ার মধ্যে হরমুজ প্রণালীকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ভূখণ্ড’ হিসেবে ঘোষণা করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বিশ্বের তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস ও সার সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান টানাপোড়েনের মধ্যে তাঁর এই মন্তব্য নতুন করে উত্তেজনা বাড়াতে পারে।
শুক্রবার নিউইয়র্কে এক অনুষ্ঠানে সমর্থকদের উদ্দেশে ট্রাম্প বলেন, ইরানকে পরাজিত করার পর খুব শিগগিরই তিনি হরমুজ প্রণালীকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণা করবেন।
ট্রাম্প বলেন, ‘ইরানকে পরাজিত করার পর, আর তারা খুব খারাপভাবেই পরাজিত হচ্ছে, খুব শিগগিরই আমি হরমুজ প্রণালীকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড ঘোষণা করব।’
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক হামলা শুরুর পর দুই পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। এর জবাবে ইরান হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করে।
যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হতো। বর্তমানে প্রণালীটির নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি আলোচনার অন্যতম প্রধান বিরোধের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
হরমুজ নিয়ে মুখোমুখি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান
জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সামরিক অভিযান বন্ধের লক্ষ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছিল। এর একটি শর্ত ছিল, বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে ইরানকে ‘সর্বোচ্চ চেষ্টা’ করতে হবে।
তবে পরে দুই পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে ওই সমঝোতা লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলে। মাস শেষ হওয়ার আগেই আবারও যুদ্ধ শুরু হয়।
ইরান এখনো প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজকে লক্ষ্য করছে। দেশটির দাবি, হরমুজ প্রণালীর একটি অংশ তাদের আঞ্চলিক জলসীমার মধ্যে পড়েছে এবং সে কারণে ওই অংশের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতেই রয়েছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও প্রণালীতে নিজস্ব অবরোধ চালু করেছে। চলতি সপ্তাহেই ইরানের বন্দরের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করার অভিযোগে একটি পণ্যবাহী জাহাজে গুলি চালায় মার্কিন বাহিনী।
শুক্রবারের বক্তব্যে ট্রাম্প এই অবরোধকে অপ্রতিরোধ্য বলে দাবি করেন। যেসব দেশ এই জলপথের ওপর নির্ভরশীল, তাদের জন্য এটি এক ধরনের জনসেবা বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা যা করছি, তা বিশ্বের জন্য বড় একটি সেবা—শুধু নিজেদের জন্য নয়, বিশ্বের জন্য।’ তিনি আরও বলেন, ‘অবরোধ থামানো যাবে না। এটি ইস্পাতের দেয়াল।’
ট্রাম্প নিউইয়র্কে গিয়েছিলেন ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থীদের সমর্থন জানাতে। এই নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা রিপাবলিকানদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সমাবেশে ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে জয়ের দাবি আবারও করেন। তবে যুদ্ধ এখনো চলছে এবং এর সমাপ্তির কোনো স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
যুক্তরাষ্ট্রে যুদ্ধটির জনপ্রিয়তাও কম। জুলাইয়ের শেষ দিকে কুইনিপিয়াক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জরিপে দেখা যায়, ৬০ শতাংশ মার্কিন ভোটার ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপের বিরোধিতা করেন।
গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামরিক সরঞ্জামের মজুতের ওপর চাপ তৈরি হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সামনে আরও বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানোর সুযোগও সীমিত হয়ে আসতে পারে।
ইরানের কড়া জবাব
হরমুজ প্রণালীকে মার্কিন ভূখণ্ড ঘোষণার ট্রাম্পের বক্তব্যের জবাব দিয়েছে ইরান। দেশটির উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইন এবং আন্তর্জাতিক বিষয়ক কর্মকর্তা কাজেম গারিবাবাদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্পের বক্তব্যের সমালোচনা করেন
তিনি লেখেন, ট্রাম্প বলেছেন ইরানের পরাজয়ের পর হরমুজ প্রণালীকে শিগগিরই মার্কিন ভূখণ্ড ঘোষণা করবেন।
গারিবাবাদি বলেন, ‘হরমুজ প্রণালী কোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট, কোনো বিমানবাহী রণতরী, কোনো আদেশ বা নির্বাচনী বক্তৃতার মাধ্যমে দখল করা যায় না।’
তিনি আরও বলেন, ‘ইরান হুমকিতে ভয় পায় না এবং শক্তি প্রদর্শনে ভীতও হয় না।’
হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে টোল আরোপের ধারণাও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয় পক্ষ থেকেই এসেছে। গত মাসে ট্রাম্প বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালীর ‘অভিভাবক’ হতে পারে এবং এই জলপথ দিয়ে যাওয়া যেকোনো পণ্যের ওপর ২০ শতাংশ ফি নিতে পারে।
তবে আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের টোল আরোপ অবৈধ হবে। আন্তর্জাতিক আইন সাধারণভাবে বাণিজ্যিক নৌযানের অবাধ চলাচলের অধিকার সুরক্ষা দেয়।
ভূখণ্ড বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়ে আগেও কথা
যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড সম্প্রসারণের কথা ট্রাম্প এর আগেও বলেছেন। ২০২৫ সালে দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেওয়ার ভাষণে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে ‘ক্রমবর্ধমান একটি দেশ’ হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা বলেছিলেন।
এরপর কানাডা ও ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ডের মতো জায়গাগুলোর ওপর সার্বভৌমত্ব হস্তান্তরের জন্য চাপ তৈরি করেছেন তিনি।
শুক্রবার ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ইরানকে দুর্বল ও বিচ্ছিন্ন করতে অর্থনৈতিক চাপ ব্যবহার করবেন তিনি। কয়েক দশক ধরে ইরানের ওপর কঠোর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
অন্যদিকে, ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট নিউজম্যাক্সকে দেওয়া পৃথক এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে ইরানের অর্থনীতিকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করতে নতুন অর্থনৈতিক পদক্ষেপ ঘোষণা করতে পারে যুক্তরাষ্ট্র।
সূত্র: আলজাজিরা