চীন-তাইওয়ান একীভূতকরণে ‘হোয়াইট উলফের’ একাকী লড়াই
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
সংগঠিত অপরাধ, নির্বাচনে হস্তক্ষেপ এবং চীনের প্রভাব বিস্তারের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। কিন্তু চ্যাং আন-লো নিজেকে শান্তির দূত হিসেবেই দেখেন। তাইওয়ানের ‘চাইনিজ ইউনিফিকেশন প্রমোশন পার্টি’ (সিইউপিপি) প্রতিষ্ঠাতা চ্যাং চীনের সঙ্গে তাইওয়ানের ‘পুনরেকত্রীকরণের’ পক্ষে দীর্ঘদিন ধরে প্রচার চালিয়ে আসছেন।
‘হোয়াইট উলফ’ নামে পরিচিত চ্যাংয়ের এই অবস্থান তাইওয়ানে খুব বেশি জনপ্রিয় নয়। চীনের সঙ্গে তাইওয়ানের গভীর সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক সম্পর্ক থাকলেও ২ কোটি ৩০ লাখ মানুষের এই গণতান্ত্রিক দ্বীপটি এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে চীনের মূল ভূখণ্ড থেকে আলাদাভাবে পরিচালিত হয়ে আসছে
তাইওয়ান প্রথমে জাপানের উপনিবেশ ছিল। পরে ‘রিপাবলিক অব চায়না’র অধীনে আসে। ১৯৪০-এর দশকে চীনের গৃহযুদ্ধের শেষ দিকে ওই সরকারের নেতৃত্ব তাইওয়ানে চলে যায়। অন্যদিকে, বেইজিং তাইওয়ানকে নিজেদের একটি প্রদেশ হিসেবে দাবি করে আসছে এবং প্রয়োজন হলে শক্তি প্রয়োগ করে দ্বীপটিকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে একীভূত করার কথাও বলে।
জনমত জরিপগুলোতে দেখা যায়, অধিকাংশ তাইওয়ানি দ্বীপটির বর্তমান বাস্তবিক স্বাধীন অবস্থাই বজায় রাখতে চান।
চ্যাংয়ের অভিযোগ, তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম লাই চিং-তে স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নিয়ে বেইজিংকে সংঘাতের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। তাঁর দাবি, তাইওয়ান স্বাধীনতার পথে না গেলে যুদ্ধের আশঙ্কাও থাকবে না।
তাইওয়ানের স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নিয়ে সংঘাত উসকে দেওয়া হলে তাঁর দল প্রতিরোধ করবে-এমন মন্তব্যও করেছেন চ্যাং। তাঁর ভাষায়, তাইওয়ানের জনগণকে যুদ্ধে ‘কামানের গোলার খাদ্য’ হতে দেওয়া যাবে না।
চ্যাং দাবি করেন, সম্ভাব্য সংঘাতের সময় বেসামরিক নাগরিকদের আশ্রয় দিতে তাইওয়ানের কয়েকটি তাওবাদী মন্দির ব্যবহারের বিষয়ে তিনি চীনা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। প্রায়ই তাঁকে এমন একটি পোশাক পরতে দেখা যায়, যাতে তাইওয়ানের সশস্ত্র বাহিনীকে ‘সামনের সারিতে উঠে দাঁড়ানোর’ আহ্বান জানানো হয়েছে।
তবে তাঁর সমালোচকদের চোখে এসব বক্তব্য শুধু আপত্তিকর নয়, সম্ভাব্য রাষ্ট্রদ্রোহিতামূলকও।
তাইওয়ানের আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী লাই চুং-চিয়াং বলেন, ‘সামনের সারিতে উঠে দাঁড়ান, কামানের গোলার খাদ্য হবেন না’-এই বার্তার অর্থ শুধু চীনাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ না করার আহ্বান নয়। এর অর্থ তাইওয়ানের গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের প্রতি আনুগত্য না রাখার আহ্বানও হতে পারে।
তাইওয়ানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সিইউপিপিকে ‘রিপাবলিক অব চায়নার অস্তিত্ব এবং স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের সাংবিধানিক ব্যবস্থার জন্য হুমকি’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
গত সপ্তাহে দলটি বিলুপ্ত করার আবেদন তাইওয়ানের সাংবিধানিক আদালতে জমা দিয়েছে মন্ত্রণালয়। সরকারের অভিযোগ, সিইউপিপি বেইজিংয়ের নির্দেশে তৃণমূল পর্যায়ে প্রভাব বিস্তারের কর্মকাণ্ড চালিয়েছে, বর্তমান ও সাবেক সামরিক কর্মকর্তাদের চীনের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তিতে যুক্ত করেছে এবং নির্বাচনে হস্তক্ষেপের জন্য চীনা অর্থ ব্যবহার করেছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০০০-এর দশকের মাঝামাঝি সিইউপিপি প্রতিষ্ঠার পর থেকে দলটির অন্তত ১১ সদস্যকে জাতীয় নিরাপত্তা, অনুপ্রবেশবিরোধী বা নির্বাচনসংক্রান্ত আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে তদন্ত বা বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছে। গত ২০ বছরে দলটির আরও কয়েক ডজন সদস্যের বিরুদ্ধে সংগঠিত অপরাধ প্রতিরোধ আইনসহ অন্যান্য অপরাধের অভিযোগও উঠেছে।
চ্যাং অবশ্য তাঁর দলের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, তাইওয়ানের সামগ্রিক সমাজের তুলনায় তাঁর দলের সদস্যদের অপরাধের হার কম। তাঁর বক্তব্য, কেউ অপরাধে জড়ালে তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।
চীনের ইউনাইটেড ফ্রন্ট ওয়ার্ক ডিপার্টমেন্টের হয়ে কাজ করেন কি না-এমন প্রশ্ন এড়িয়ে গেলেও চ্যাং ওই সংস্থার কর্মকাণ্ডের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। তিনি বলেন, তাইওয়ান প্রণালির দুই পাড়ের মানুষের শান্তি ও সুখের জন্য তিনি ‘ইউনাইটেড ফ্রন্টের’ কাজকে পুরোপুরি সমর্থন করেন।
চ্যাং ক্ষমতাসীন ডেমোক্রেটিক প্রগ্রেসিভ পার্টির বিরুদ্ধেও দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছেন এবং দলের কর্মকর্তাদের কথিত দুর্নীতির ঘটনা নিয়ে একটি নথি সাংবাদিকদের দিয়েছেন।
জাতীয় আইনসভায় সিইউপিপির কোনো প্রতিনিধি নেই। দলটির নির্বাচিত সদস্য বলতে নিউ তাইপেই সিটি ও মিয়াওলি কাউন্টির দুজন স্থানীয় ওয়ার্ডেন রয়েছেন।
চ্যাং অবশ্য নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না হয়েও স্থানীয় মানুষের জন্য নানা ধরনের সহায়তা দেওয়ার দাবি করেন। আল-জাজিরার সঙ্গে সাক্ষাৎকারের আগে তিনি এমন এক তরুণীর উদ্বিগ্ন বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করেন, যিনি মিয়ানমার, লাওস ও থাইল্যান্ডের সীমান্তবর্তী গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল এলাকায় একটি প্রতারণা চক্রের কেন্দ্রে আটকা পড়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
চ্যাংয়ের দাবি, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন প্রতারণা কেন্দ্রে পাচারের শিকার হওয়া কয়েক ডজন তাইওয়ানিকে দেশে ফিরিয়ে আনতে তিনি মধ্যস্থতা করেছেন। ঋণের ফাঁদে পড়া মানুষকে মহাজনদের সঙ্গে দেনা পরিশোধের শর্ত পুনর্নির্ধারণে সহায়তা করার কথাও বলেছেন তিনি। তবে তাঁর এসব দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি আল-জাজিরা।
সিইউপিপির একাধিক সদস্যের বিরুদ্ধে তাইওয়ানের অন্যতম পরিচিত অপরাধী সংগঠন ‘বাঁশ ইউনিয়ন’-এর সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগে তদন্ত হয়েছে। ১৯৫০-এর দশকে চীনা অভিবাসীদের সন্তানদের হাতে সংগঠনটি গড়ে উঠেছিল।
চ্যাং নিজেও স্বীকার করেছেন, তরুণ বয়সে তিনি বাঁশ ইউনিয়নের একজন জ্যেষ্ঠ সদস্য ছিলেন। তাঁর দাবি, ১৯৬৮ সালে তিনি সংগঠনটি ছেড়ে দেন।
১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে মাদক পাচারের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের একটি ফেডারেল কারাগারে তিনি ১০ বছর ছিলেন। মুক্তির পর তাইওয়ানে ফেরত পাঠানো হলে সেখানে সংগঠিত অপরাধের বিরুদ্ধে অভিযান চলার সময় তিনি চীনে চলে যান।
২০১৩ সালে তাইওয়ানে ফেরার পর সংগঠিত অপরাধ প্রতিরোধ আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে বিমানবন্দরেই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রত্যাহার করে প্রসিকিউশন।
এরপর নিজেকে চীনা জাতীয়তাবাদী হিসেবে নতুনভাবে তুলে ধরেন চ্যাং। সিইউপিপিরও প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন তিনি।
এদিকে, দলটি বিলুপ্ত করার উদ্যোগের সমালোচনা করেছে চীন। বেইজিংয়ের তাইওয়ানবিষয়ক কার্যালয়ের মুখপাত্র চেন বিনহুয়া বলেছেন, তাইওয়ানের স্বাধীনতাবাদী প্রচেষ্টার বিরোধিতা এবং পুনরেকত্রীকরণের পক্ষে অবস্থান নেওয়া বৈধ ও ন্যায়সংগত।
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে চীনা দূতাবাস এ বিষয়ে আল-জাজিরার মন্তব্যের অনুরোধের জবাব দেয়নি।
তাইওয়ানের রাজনৈতিক বিজ্ঞানী পু-চাও হাং মনে করেন, সিইউপিপি বিলুপ্ত করা তাইপেইয়ের জন্য মূলত প্রতীকী সাফল্য হবে। তাঁর মতে, দলটি বিলুপ্ত হলেও চীনের প্রভাব বিস্তারের কর্মকাণ্ড বন্ধ হবে না।
হাং বলেন, একটি রাজনৈতিক দল বিলুপ্ত করলেই এর সঙ্গে যুক্ত মানুষ, অর্থের উৎস বা স্থানীয় নেটওয়ার্ক অদৃশ্য হয়ে যায় না। চীনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড তাইওয়ানে একাধিক স্থানীয় নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভর করে; সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অন্য সংগঠন, নাগরিক গোষ্ঠী বা প্রতিষ্ঠানে চলে যেতে পারেন।
১৯৯৭ সালে হংকং চীনের কাছে হস্তান্তরের আগে বেইজিংও একই ধরনের কৌশল নিয়েছিল। তখন রাজনৈতিক অভিজাত ও নাগরিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলে চীনের পক্ষে সমর্থন জোরদার করা হয়েছিল।
চ্যাং মনে করেন, চীনের সঙ্গে তাইওয়ানের ‘শান্তিপূর্ণ’ পুনরেকত্রীকরণের ক্ষেত্রে হংকং একটি কাঠামো হতে পারে। তাঁর মতে, আলোচনায় বসাই সবচেয়ে ভালো পথ।
চ্যাং বলেন, ১৯৭৮ সালেই চীন একীভূতকরণের জন্য অনুকূল কিছু শর্তের প্রস্তাব দিয়েছিল। দুই পক্ষ আলোচনায় বসলে জাতীয় সংগীত, পতাকা ও নাম-সবকিছু নিয়েই আলোচনা করা সম্ভব বলে তখন জানানো হয়েছিল।
চ্যাংয়ের দৃষ্টিতে তাইওয়ান ও চীন একই দেশ-নাম ‘রিপাবলিক অব চায়না’ হোক বা ‘পিপলস রিপাবলিক অব চায়না’। তাঁর ভাষায়, ‘দুই পক্ষই চীনের প্রতিনিধিত্ব করে, আর আমরা সবাই চীনা।’
সূত্র: আলজাজিরা