২০২২-এর যুদ্ধবিরতির পর ইয়েমেনে যুদ্ধের শঙ্কা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির পর যেকোনো সময়ের তুলনায় ইয়েমেন এখন আবার পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘ।
গত কয়েক দিনে ইয়েমেনের বিভিন্ন স্থবির যুদ্ধফ্রন্টে সামরিক তৎপরতা বেড়েছে। হামলায় সামরিক ও বেসামরিক হতাহতের ঘটনাও ঘটেছে বলে বৃহস্পতিবার জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদকে জানিয়েছেন ইয়েমেনবিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ দূত হ্যান্স গ্রুন্ডবার্গ।
ইরান-সমর্থিত হুথি যোদ্ধাদের সঙ্গে সরকারি বাহিনীর সংঘর্ষ হয়েছে মারিব, হাদরামাউত, আল-মাখা (মোখা)সহ বিভিন্ন এলাকায়।
আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এবং এডেনভিত্তিক ইয়েমেনি সরকার জানিয়েছে, তারা তাইজে হুথিদের একটি হামলা প্রতিহত করেছে। বুধবার সরকার আরও জানায়, কয়েকটি গভর্নরেটে হুথি অবস্থান লক্ষ্য করে গোলাবর্ষণ ও ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে।
ইয়েমেনের প্রেসিডেনশিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের প্রধান বুধবার হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, হুথিদের প্রতিটি পদক্ষেপের জবাব দেওয়া হবে ‘সর্বাত্মক প্রতিক্রিয়া বা প্রতিরোধের’ মাধ্যমে।
গ্রুন্ডবার্গ সব পক্ষকে অবিলম্বে উত্তেজনা কমানোর আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে কার্যকর ও শক্তিশালী যুদ্ধবিরতির দিকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
লোহিত সাগর নিয়ে নতুন উদ্বেগ
হুথিরা লোহিত সাগরে আবার জাহাজ চলাচলে হামলা শুরু করায় ইয়েমেন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে বলে সতর্ক করেছেন জাতিসংঘের বিশেষ দূত।
গ্রুন্ডবার্গ ইয়েমেনের বিপর্যস্ত অর্থনীতির জন্য ‘অর্থনৈতিক উত্তেজনা প্রশমন’-এর ওপরও জোর দিয়েছেন। প্রায় এক দশকের গৃহযুদ্ধে দেশটির অর্থনীতি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এ জন্য তিনি সংঘাতরত পক্ষগুলোকে বাণিজ্যিক জাহাজের ইয়েমেনি বন্দরগুলোতে পৌঁছানো অব্যাহত রাখা, তেল রপ্তানি আবার চালু করা এবং হুথি নিয়ন্ত্রিত সানা বিমানবন্দরে বাণিজ্যিক ফ্লাইট পুনরায় চালুর ব্যবস্থা করার আহ্বান জানান।
জাতিসংঘের বিশেষ দূতের মতে, এসব ক্ষেত্রে সংঘাতের দুই পক্ষেরই ‘বিরোধের চেয়ে সহযোগিতা থেকে লাভ বেশি’।
২০১৪ থেকে গৃহযুদ্ধ
২০১৪ সালে হুথিরা রাজধানী সানা দখল করার পর থেকেই ইয়েমেনে সংঘাত চলছে। পরের বছর সৌদি আরবের নেতৃত্বে সামরিক জোট হুথিদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করলে তা দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে রূপ নেয়।
২০২২ সালে হুথি ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের মধ্যে যুদ্ধবিরতি হয়। এরপর থেকে তা মোটামুটি কার্যকর ছিল। তবে ২০২৩ সালে আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়তে শুরু করলে যুদ্ধের স্থায়ী অবসানের লক্ষ্যে অগ্রগতি থেমে যায় বলে জানান গ্রুন্ডবার্গ।
এদিকে, আগস্টের শুরুতে হুথিদের হামলার পর ইয়েমেনের সরকারি নিয়ন্ত্রিত আল-মাখা বন্দরে একটি ডুবে যাওয়া জাহাজের কেবল ওপরের অংশ পানির ওপরে দেখা যায়।
আরও গভীর হচ্ছে মানবিক সংকট
নতুন করে লড়াই বাড়ায় ইয়েমেনের ভয়াবহ মানবিক সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
জাতিসংঘের মানবিক সহায়তাবিষয়ক প্রধান টম ফ্লেচার বৃহস্পতিবার নিরাপত্তা পরিষদকে জানান, ইয়েমেনের অর্ধেকের বেশি মানুষ পর্যাপ্ত খাবারের নির্ভরযোগ্য সংস্থান থেকে বঞ্চিত। প্রায় ৬০ লাখ মানুষ এমন মাত্রার খাদ্যসংকটে রয়েছে, যা দুর্ভিক্ষের কাছাকাছি ‘জরুরি’ পরিস্থিতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সংঘাতের সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছেন নারীরাও। ফ্লেচার বলেন, প্রতিরোধযোগ্য গর্ভাবস্থাজনিত জটিলতায় প্রতিদিন তিনজন নারী মারা যাচ্ছেন।
বৃহস্পতিবার ব্রিটিশ সরকার ইয়েমেনের মানবিক সংকটের জন্য হুথিদের দায়ী করেছে। আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলে প্রাণঘাতী হামলা এবং সৌদি আরবে সরাসরি হামলারও সমালোচনা করেছে তারা।
জাতিসংঘে যুক্তরাজ্যের স্থায়ী প্রতিনিধি সারা ম্যাকইনটশ নিরাপত্তা পরিষদকে বলেন, ‘বেপরোয়া হুথি কর্মকাণ্ড’ এই অঞ্চলে সহিংসতার গুরুতর বিস্তার ঘটিয়েছে। তাঁর আহ্বান, ইয়েমেনিদের দুর্ভোগ কমানো ও শান্তি প্রতিষ্ঠার বদলে হুথিদের এমন কোনো কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকতে হবে, যা ইয়েমেনকে বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতে জড়িয়ে ফেলতে পারে।
সৌদি আরবে হুথিদের ড্রোন হামলা
বৃহস্পতিবার হুথিরা সৌদি আরবের জাজান প্রদেশের একটি তেল শোধনাগারে ড্রোন হামলার দায় স্বীকার করেছে।
হুথিদের একটি সামরিক সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, সৌদি আরব সাদা ও হাজ্জাহ প্রদেশে ইয়েমেনের আকাশসীমা ও সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করায় ওই হামলা চালানো হয়েছে।
২০ জুলাই হুথিরা লোহিত সাগরে সৌদি জাহাজ চলাচলে অবরোধ ঘোষণা করার পর দুই পক্ষের মধ্যে ড্রোন, বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা-পাল্টা হামলার ধারাবাহিকতায় তেল শোধনাগারে হামলাটি সর্বশেষ ঘটনা।
জাতিসংঘের আশঙ্কা, ইয়েমেনের স্থবির যুদ্ধফ্রন্টে নতুন করে সংঘাত বাড়তে থাকলে ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির পর দেশটি সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখে পড়তে পারে। একই সঙ্গে লোহিত সাগর ও সৌদি আরবকে ঘিরে নতুন হামলা ইয়েমেনের সংকটকে আরও বড় আঞ্চলিক সংঘাতে পরিণত করার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
সূত্র: আলজাজিরা