সৌদি সহায়তা ইয়েমেনের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের জীবনরেখা: জাতিসংঘে
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
ইয়েমেনের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সচল রাখতে সৌদি আরবের ধারাবাহিক রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও মানবিক সহায়তা ‘জীবনরেখা’ হিসেবে কাজ করছে বলে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদকে জানিয়েছেন দেশটির জাতিসংঘে স্থায়ী প্রতিনিধি আবদুল্লাহ আল-সাদি।
বৃহস্পতিবার নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি বলেন, সৌদি নেতৃত্বের ‘আন্তরিক ভ্রাতৃসুলভ সমর্থন’ ছাড়া ইয়েমেনের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা ধরে রাখতে পারত না।
রিয়াদের সহায়তায় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সংহতি বজায় রাখা, মানবিক দুর্ভোগ কমানো এবং দেশের পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা বাড়াতে ‘গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে’ অর্থায়ন সম্ভব হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
ইয়েমেনের বর্তমান সংকট কোনো অনিবার্য পরিণতি নয়, বরং হুথিদের ‘অভ্যুত্থানের’ ফল বলে মন্তব্য করেন আল-সাদি। তাঁর অভিযোগ, হুথিরা রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার বদলে বিশৃঙ্খলা ও যুদ্ধ, আর সমান নাগরিক অধিকারের বদলে সাম্প্রদায়িকতাকে বেছে নিয়েছে।
তাঁর দাবি, হুথিরা ইয়েমেনের জনগণের নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা ও মর্যাদার আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে ইরানি সরকারের স্বার্থের ওপর নির্ভর করার পথ বেছে নিয়েছে।
ইরানের সঙ্গে ‘আকাশপথ’
হুথিদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দুর্বল করা, জাতীয় অর্থনীতিতে আঘাত, হাজারো শিশুকে সংগঠনে নিয়োগ, সম্পদ ও মানবিক সহায়তা লুট এবং নির্বিচারে আটক ও গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলেন আল-সাদি।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, অস্ত্র ও বিশেষজ্ঞ স্থানান্তরের জন্য হুথিরা ‘সানা ও তেহরানের মধ্যে একটি আকাশ সেতু’ তৈরির চেষ্টা করছে। এ কাজে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এবং জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা বিমান সংস্থা মাহান এয়ার ব্যবহারের অভিযোগও করেন তিনি।
আল-সাদির দাবি, ইয়েমেন সরকারের অনুমতি ছাড়াই ইরানি কয়েকটি বিমান সানা ও হোদেইদায় অবতরণ করেছে। তাঁর মতে, এটি ইয়েমেনের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন এবং নিরাপত্তা পরিষদও এ ধরনের কর্মকাণ্ডের নিন্দা করেছে।
সম্প্রতি হুথিদের চালানো হামলার একটি তালিকাও নিরাপত্তা পরিষদের সামনে তুলে ধরেন তিনি। এর মধ্যে রয়েছে লোহিত সাগর ও বাব আল-মানদাব প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা, সৌদি আরবের ভেতরে বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা, ইয়েমেনে সামরিক ঘাঁটি, বেসামরিক অবকাঠামো ও বাস্তুচ্যুতদের শিবিরে ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং আল-মোখা বন্দরে হামলা।
খাদ্যবাহী জাহাজে হামলার অভিযোগ
মঙ্গলবার ইয়েমেনে খাদ্য সরবরাহ নিয়ে যাওয়া একটি জাহাজে হুথি বাহিনী হামলা চালিয়েছে বলে আল-সাদি জানান। এতে জাহাজটির চারজন ক্রু নিহত হন-তিনজন পাকিস্তানি ও একজন ইন্দোনেশীয়। আহত হন আরও চারজন।
এরপর উদ্ধারকারীদের লক্ষ্য করে দ্বিতীয় একটি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয় বলেও দাবি করেন তিনি। এতে আরও একজন আহত হন।
আল-সাদি এটিকে ‘সমুদ্রপথে চলাচল নিয়ন্ত্রণকারী নিয়ম ও রীতির প্রতি’ হুথিদের অবজ্ঞার প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণের বাইরে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও অন্যান্য অস্ত্র সক্ষমতা থাকার বিপদও এই ঘটনা স্পষ্ট করেছে।
তিনি বলেন, ইয়েমেনের মানুষের জীবনযাত্রার অবনতির জন্য নিজেদের দায় এড়াতে হুথিরা বছরের পর বছর অবরোধের অভিযোগ প্রচার করেছে। অথচ তাঁর দাবি, হুথিরাই ইয়েমেনের বন্দরগুলোতে হামলা চালিয়ে বাণিজ্য ব্যাহত করছে এবং মানুষের দুর্ভোগ বাড়াচ্ছে।
আল-সাদির ভাষায়, হুথিরা ইয়েমেনের ভূখণ্ডকে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের স্বার্থ বাস্তবায়নের একটি ঘাঁটিতে পরিণত করেছে। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ওপর চাপ সৃষ্টি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও নৌ চলাচল হুমকির মুখে ফেলা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
বন্দীদের মুক্তি ও জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা
জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় ১ হাজার ৬০০ বন্দী ও আটক ব্যক্তিকে মুক্তি দেওয়ার যে চুক্তি হয়েছিল, হুথিরা তা থেকে সরে এসেছে বলেও অভিযোগ করেন আল-সাদি।
তাঁর দাবি, মানবিক বিষয়কে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার এবং দর-কষাকষি ও চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে কাজে লাগানোর ধারাবাহিকতার অংশ এটি।
জাতিসংঘের কর্মী, মানবিক সহায়তাকর্মী, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং কূটনৈতিক কর্মকর্তাদেরও হুথিরা নির্বিচারে আটক করে রাখছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। নিরাপত্তা পরিষদ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আহ্বান উপেক্ষা করে এসব আটক অব্যাহত রয়েছে দাবি করে তিনি বন্দীদের অবিলম্বে ও নিঃশর্ত মুক্তির জন্য পরিষদের ওপর চাপ বাড়ানোর আহ্বান জানান।
আল-সাদি বলেন, হুথিদের নিন্দা করা স্বাগত হলেও শুধু নিন্দা যথেষ্ট নয়। তাদের বিরুদ্ধে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ২১৪০ ও ২২১৬ নম্বর প্রস্তাব বাস্তবায়ন করতে হবে।
এর মধ্যে হুথিদের কাছে অস্ত্র পাচার বন্ধ করা এবং জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা ব্যবস্থা লঙ্ঘনকারীদের জবাবদিহির আওতায় আনার উদ্যোগও থাকতে হবে।
তাঁর ভাষায়, হুথিদের হাতে এসব অস্ত্র ও প্রযুক্তি অব্যাহতভাবে থাকা টেকসই শান্তির জন্য বাধা। এটি ইয়েমেন, প্রতিবেশী দেশগুলো এবং আন্তর্জাতিক নৌপথের জন্য ‘স্থায়ী হুমকি’ তৈরি করছে।
‘রাষ্ট্রকে একটি সুযোগ দিন’
বক্তব্যের শেষ দিকে ইয়েমেনের প্রেসিডেনশিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের চেয়ারম্যান রাশাদ আল-আলিমির নিরাপত্তা পরিষদের প্রতি করা একটি আহ্বান তুলে ধরেন আল-সাদি-‘রাষ্ট্রকে একটি সুযোগ দিন।’
তিনি বলেন, ইয়েমেন সরকারের এই আহ্বান শুধু আন্তর্জাতিক সংহতির অনুরোধ নয়। এর সঙ্গে বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, নৌ চলাচলের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা ব্যবহারের প্রত্যাখ্যানের মতো মৌলিক নীতিগুলো জড়িত।
সূত্র: আলজাজিরা