ইরানের ট্রাম্প হত্যাচক্রান্তের সতর্কতা যাচাই করতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র

 প্রকাশ: ১৪ অগাস্ট ২০২৬, ১১:৫৪ পূর্বাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

ইরানের ট্রাম্প হত্যাচক্রান্তের সতর্কতা যাচাই করতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হত্যার জন্য ইরান পরিকল্পনা করছে-ইসরায়েলের কাছ থেকে গত এক বছরে এমন একাধিক সতর্কবার্তা পেলেও সেগুলোর কয়েকটি স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। বর্তমান ও সাবেক তিন মার্কিন কর্মকর্তা রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছেন।

সতর্কবার্তাগুলোতে ট্রাম্পকে গুলি করে হত্যার জন্য স্নাইপার ব্যবহার কিংবা বড় কোনো জনসমাবেশে ছুরি হামলার জন্য কাউকে নিয়োগের মতো সম্ভাব্য পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছিল। কিছু তথ্য মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে দেওয়া হয়, আবার কিছু ক্ষেত্রে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা সরাসরি হোয়াইট হাউসের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদেরও তা জানান।

সূত্রগুলোর ভাষ্য, ২০২৫ সালের জুনে ১২ দিনের যুদ্ধের আগে থেকেই এসব সতর্কবার্তা আসতে শুরু করে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান শুরুর আগে তা আরও জোরালো হয়।

তুরস্ক সফরের আগে সবচেয়ে বিস্তারিত সতর্কতা

সবচেয়ে বিস্তারিত সতর্কতাটি দেওয়া হয় জুলাইয়ে তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় ন্যাটো সম্মেলনের আগে। মার্কিন কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলি কর্মকর্তারা হোয়াইট হাউসকে জানিয়েছিলেন, তুরস্ক সফরের সময় ট্রাম্পকে হত্যার চেষ্টা করতে পারে ইরান।

এমনকি এয়ার ফোর্স ওয়ানে ট্রাম্পের যাত্রার সময় কাঁধ থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলার আশঙ্কার কথাও জানানো হয়েছিল।

এই সতর্কতার পরও মার্কিন গোয়েন্দারা ইসরায়েলি দাবির পক্ষে স্বাধীন কোনো প্রমাণ খুঁজে পায়নি। তুরস্কের একজন কর্মকর্তাও জানিয়েছেন, দেশটির গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ট্রাম্পের বিরুদ্ধে এমন হুমকির কোনো প্রমাণ পায়নি এবং তাদের এই মূল্যায়ন যুক্তরাষ্ট্রকেও জানানো হয়েছিল।

তবু অতিরিক্ত সতর্কতার অংশ হিসেবে ট্রাম্পের নিরাপত্তায় নজিরবিহীন পদক্ষেপ নেয় মার্কিন কর্তৃপক্ষ। তুরস্ক সফর শেষে তাঁকে এয়ার ফোর্স ওয়ান থেকে অন্য একটি বিমানে সরিয়ে নেওয়া হয়, যাতে সম্ভাব্য হামলাকারীদের বিভ্রান্ত করা যায়।

ইরান নিয়ে গোয়েন্দা মূল্যায়নে মতভেদ

ইরানের সামরিক কমান্ডার কাসেম সোলাইমানিকে ২০২০ সালে হত্যার প্রতিশোধ নিতে তেহরান ট্রাম্পকে লক্ষ্য করতে চায়-এমন মূল্যায়ন দীর্ঘদিন ধরেই করে আসছে মার্কিন গোয়েন্দা সম্প্রদায়।

তবে গত বছরের শুরু থেকে ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের দেওয়া ট্রাম্পকে হত্যার নির্দিষ্ট কয়েকটি পরিকল্পনার তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করতে পারেনি কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ।

দুই মার্কিন কর্মকর্তার ভাষ্য, ইরান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দুই সামরিক অভিযানের সময়ও কয়েকটি ক্ষেত্রে ট্রাম্পকে হত্যার পরিকল্পনাসহ ইরানের হুমকি বিষয়ে ইসরায়েলি গোয়েন্দা তথ্যকে সিআইএ ‘কম আস্থার’ তথ্য হিসেবে মূল্যায়ন করেছিল।

এসব মূল্যায়ন ট্রাম্প প্রশাসনের কতজন কর্মকর্তার কাছে পৌঁছেছিল, তা স্পষ্ট নয়

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের গোয়েন্দা মূল্যায়নে মতভেদ রয়েছে। চলতি বছরের শুরুতে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো মনে করেছিল, ইরান সক্রিয়ভাবে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে না। ইসরায়েল অবশ্য তেহরানকে তাৎক্ষণিক হুমকি হিসেবে দেখেছিল।

মার্কিন গোয়েন্দাদের ওই মূল্যায়ন সত্ত্বেও ফেব্রুয়ারিতে ইরানে হামলার সিদ্ধান্ত নেন ট্রাম্প। এর আগে ট্রাম্পকে হত্যার জন্য তেহরান চেষ্টা চালিয়েছে-ইসরায়েল থেকে পাওয়া এমন গোয়েন্দা তথ্যও তিনি বিবেচনায় নিয়েছিলেন বলে রয়টার্স আগে জানিয়েছিল।

ইসরায়েলের দাবি, তথ্য দিয়ে নীতি প্রভাবিত নয়

মার্কিন নীতিনির্ধারণে ইসরায়েলি গোয়েন্দা তথ্য ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ অস্বীকার করেছে ওয়াশিংটনে ইসরায়েলি দূতাবাস।

দূতাবাসের এক মুখপাত্র বলেছেন, যারা ইসরায়েলকে গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে মার্কিন নীতিতে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করার অভিযোগ করছে, তারাই আবার নিজেদের স্বার্থে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপনের অভিযোগও তুলতে পারে।

হোয়াইট হাউস ও সিআইএ এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।

মার্কিন সিক্রেট সার্ভিসের মুখপাত্র অ্যান্থনি গুগলিয়েলমি নির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্য নিয়ে মন্তব্য করেননি। তবে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক হত্যাচেষ্টা এবং প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে হুমকি বাড়ার মধ্যে ট্রাম্পের নিরাপত্তায় সংস্থাটি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে।

ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের ওপর নির্ভরতা

মধ্যপ্রাচ্য, বিশেষ করে ইরানসংক্রান্ত বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই ইসরায়েলি গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করে আসছে।

বর্তমান ও সাবেক মার্কিন কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ইরানসংক্রান্ত ইসরায়েলি গোয়েন্দা তথ্য সাধারণত আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে সিআইএ বা ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সির কাছে পৌঁছায়। এরপর মার্কিন সংস্থাগুলো তা বিশ্লেষণ করে।

তবে ইসরায়েলি গোয়েন্দা তথ্য সব সময় স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয় না। সে ক্ষেত্রে অন্যান্য উৎসের তথ্য মিলিয়ে তার বিশ্বাসযোগ্যতা ও নির্ভুলতা যাচাইয়ের চেষ্টা করা হয়।

সাবেক কর্মকর্তাদের ভাষ্য, গত এক বছরে ইসরায়েলের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও প্রতিনিধিরা সরাসরি হোয়াইট হাউসের সঙ্গে যোগাযোগ করে ইরানের হুমকি বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের ব্রিফ করেছেন। এসব বৈঠকের কিছু হোয়াইট হাউসের সিচুয়েশন রুমেও হয়েছে।

এই সরাসরি যোগাযোগের ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরেই মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে।

সাবেক কর্মকর্তাদের দাবি, গত বছর ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্সের পরিচালকের কার্যালয়ের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়ার মধ্যে সিআইএ ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স কাউন্সিলের সঙ্গে গোয়েন্দা সমন্বয় ও তথ্য আদান-প্রদান বন্ধ করে দেয়। মার্কিন গোয়েন্দা সম্প্রদায়ের এই শীর্ষ বিশ্লেষণী সংস্থায় আগে সবচেয়ে বেশি তথ্য দিত সিআইএ।

ফলে এখন ইরানসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গোয়েন্দা সম্প্রদায়ের সমন্বিত ও পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়নের সংখ্যাও কমে গেছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।

Advertisement
Advertisement
Advertisement